সুন্দরবন ঘিরে শুটকির মৌসুম সাধারণত দক্ষিণাঞ্চলের জেলে ও ব্যবসায়ীদের জন্য আশার বার্তা বয়ে আনে। কিন্তু এবার সেই মৌসুমই রূপ নিয়েছে আতঙ্কে। দুবলার চর-কেন্দ্রিক উপকূলে জলদস্যু ও বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যে সাগর হয়ে উঠেছে অনিরাপদ। মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সাগর থেকে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি; অর্থ দিতে না পারলে চলে নির্মম নির্যাতন। নিরাপত্তাহীনতায় শত শত ট্রলার ও নৌকা মাঝপথেই ফিরে আসছে, ফলে শুটকি মৌসুমে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি ও আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছেন জেলে ও ব্যবসায়ীরা।
দুবলার চরের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে গোটা সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কমপক্ষে ২০টি দস্যু বাহিনী। এসব বাহিনীর মধ্যে দুর্ধর্ষ ছয়-সাতটি বাহিনী পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এবং বঙ্গোপসাগর নিয়ন্ত্রণ করছে। গত এক সপ্তাহে প্রায় একশত জেলেকে জিম্মি করেছে জলদস্যুরা। এর মধ্যে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনী শুঁটকিপল্লীর শেরার চর থেকে দুটি ট্রলারসহ ছয় জেলেকে, ১৬ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে বঙ্গোপসাগরের নারকেলবাড়িয়া থেকে আটজন এবং একই রাতে সাগরের আমবাড়িয়া এলাকা থেকে আরও ১২ জনসহ ২০ জেলেকে অপহরণ করে জলদস্যু জাহাঙ্গীর ও সুমন বাহিনী।
খুলনার ইব্রাহিম ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির আবুল কালাম আজাদ বলেন, খুলনার ঘাটে সুন্দরবন থেকে ট্রলারে করে শুটকি নিয়ে আসেন জেলে ব্যবসায়ীরা। সাত নম্বর ঘাট থেকে আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুটকি পরিবহন করি। কিন্তু এবার শুটকি তুলনামূলক কম আসছে। মূলত সাগরে দস্যু বাহিনীর তৎপরতায় জেলেরা সাগরে যাচ্ছেন না। অনেকে ফেরত আসছেন। যার কারনে শুটকি উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে বলে জেলে ও ব্যবসায়ীরা বলছেন।
তিনি আরও বলেন, খুলনায় আসা জেলেদের কাছে থেকে গত এক সপ্তাহে একশত জন জেলেকে ডাকাতরা জিম্মি করেছে বলে জানতে পেরেছি।
বনবিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা দুবলার চর, আলোরকোল, নারকেলবাড়িয়া, শেলারচর, মেহের আলীর চর, মাঝের কিল্লা, সোনাকাটা, আশার চর, চাবরাখালি, কোকিলমনি, কবরখালি, মানিকখালি এবং ছোট ও বড় আমবাড়িয়া চরেও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ হয়। এর মধ্যে দুবলার চর সব থেকে বড় শুটকি পল্লি। দুবলার চরের শুটকি পল্লি ৫টি চর নিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সবগুলো চরে শুটকি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সিজনের সময়ে ১০ থেকে ১২ হাজার জেলে কাজ করেন। এখান থেকে শুটকি প্রক্রিয়াকরণ করে বাজারজাতকরণ করেন শুটকি ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দুবলার চরে এবার দস্যু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জনের ওপর জেলেকে জিম্মি করেছে দস্যুরা। টাকা দিতে পারলে কিছু কিছু জেলেকে ছেড়ে দিয়েছে দস্যুরা।
শুটকি ব্যবসায়ীরা বলেন, এ বছর শুটকি পল্লি দুবলার চরে দস্যু আতঙ্কে রয়েছেন হাজার হাজার জেলে ও শুটকি ব্যবসায়ী। একজন বাহাদ্দার (জেলেদের দলনেতা) লাখ লাখ টাকা ঋণ করে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে তার দল নিয়ে সাগরে যান। এই চরের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। প্রতিবছর ঋণ করে জেলেরা সাগরে যায় মাছ ধরতে। আর এদিকে দস্যুদের যন্ত্রণায় চরে থাকা এবং সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জীবন আরও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। অনেক জেলেকে জিম্মি করার ঘটনায় দুবলার চরের এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত দস্যু আতঙ্কে রয়েছেন।
শুটকি ব্যবসায়ী বাহাদ্দর হারুন শিকদারের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শুটকির সিজন থাকে। এ সময় আমরা মাছ ধরতে যাই। মাছ ধরতে গেলে আমাদের অনেক জেলে ভাইদের সঙ্গে করে নিতে হয়। কেউ কেউ তিন মাসের জন্য উপকূলে আসেন। তিন মাসের জন্য তাদের পরিবারের খোরাকি ও টাকা পয়সা দিয়ে আসতে হয়। এ টাকা তো আমাদের ধার-দেনা করে আর বড় ব্যবসায়ীদের কাছে দিয়ে অগ্রিম নিয়ে দিতে হয়। আমাদের সাগরে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে মাছ ধরতে হলে লাভ তো হবে না আর উল্টো ঋণগ্রস্ত হয়ে মরতে হবে। জেলেদেরে জীবন এতো সহজ না।
অন্য একজন দলনেতা বাহারুল সরদার জানান, আমরা বারো মাস সাগরে থাকতে পারি না। সিজনের সময় সাগরে যাই। কিন্তু এবার দস্যুদের কারনে সাগর থেকে ফেরত আসতে হয়েছে। বাজার করতে শুটকির ট্রলারের সঙ্গে খুলনায় আসছি। ফিরতি ট্রলারে আবার যাবো দুবলার চরে। নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড টহল বৃদ্ধি করলে আমরা সাগরে নামবো আবার।
জেলে শ্যামল জানান, আমরা একটা ট্রলারে ১৫ থেকে ২০ জন জেলে থাকি। মাছ ধরে আমরা চরে ফেরত আসি। আবার ট্রলার নিয়ে অন্য একটা গ্রুপ যায়। কিন্তু এবার আমাদের অনেক জেলেকে ডাকাতরা ধরে নিয়ে আটকে মুক্তিপণ চাচ্ছে। দস্যুরা ট্রলার প্রতি মোটা অঙ্কের চাঁদা চাচ্ছে। না হলে মাছ ধরতে দেবে না। আমরা টাকা কীভাবে দেবো?
তিনি আরও বলেন, একজন জেলের জন্য জন প্রতি ১ লাখ টাকাও আদায় করেছে দস্যুরা। আর ট্রলার প্রতি প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকাও চেয়েছে দস্যুরা। দিতে না পারলে গুলির ভয় দেখিয়ে চরে পাঠিয়ে দেয়। প্রতিবাদ করলে ডাকাতরা নিয়ে যায়। টাকা দিলে ছেড়ে দেয়।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলা থেকে চরে যাওয়া জেলে জোয়াব শিকদার বলেন, আমি দেড় মাসের জন্য এসেছি। মার্চে আবার ফেরত যাবো বাড়ি। দেড় মাসে সমিতি থেকে টাকা তুলে ঘরে প্রায় বিশ হাজার টাকা দিয়ে এসেছি। মাছ ধরে লাভের টাকা নিয়ে ফিরলে ছয় মাস ভালো কাটাতে পারবো। সামনে ঈদ, কিন্তু দস্যুদের কারনে সাগরে যেতে ভয় লাগছে। একবার জিম্মি করলে ৩০- থেকে ৫০ হাজার টাকা রক্ত বেচে হলেও দিয়ে আসতে হবে। প্রশাসন একটু সক্রিয় হলে দস্যুদের হানা চরাঞ্চল দিয়ে কমে যেতো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুলনা বন বিভাগের কর্মকর্তা বলেন, বনদস্যুর উৎপাতে সুন্দরবনের নিয়মিত জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। বর্তমানে স্টেশন অফিস থেকে সীমিত আকারে পাস-পারমিট নিচ্ছেন জেলেরা। যার কারণে স্টেশন থেকে মাসিক রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হচ্ছে না। জীবনের মায়া ত্যাগ করে কোনো জেলে সাগরে যেতে চাইবে না স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন ঘিরে দস্যুতা বেড়েছে। আমরা দস্যুদের মুখোমুখি হলেও কিছু করার থাকে না। আমরা জেলেদের হয়ে কথা বলতে গেলে ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়। এমনকি টাকা আমাদের দিতে বলে। আমরা এসব বিষয়ে অফিসিয়ালভাবে কিছু বললে ডাকাতরা জেলেদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। তবে প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড আর র্যাব যৌথ অভিযান পরিচালনা করলে এসব অঞ্চল দস্যু মুক্ত করা সম্ভব।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, অপহৃতদের উদ্ধারে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহযোগিতার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, দস্যুদের ভয়ে দুবলার শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্রের জেলেরা সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন। যার কারনে মাছ সংকটে শুঁটকি উৎপাদনে ধস নেমেছে। এমনকি রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরিফুর রহমান/এনএইচআর/এএসএম