আজ ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস। জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটিই জনপ্রিয় অভিনেতা রাশেদ সীমান্ত’র জন্মদিন। ২০১৮ সালে ‘যেই লাউ সেই কদু’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়ে তার যাত্রা শুরু। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। অল্প সময়ের মধ্যে শতাধিক নাটকে অভিনয় করে মানুষের প্রশংসায় ভেসেছেন। হয়ে উঠেছেন জনপ্রিয় মুখ।
জন্মদিনে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন জাগো নিউজের। জানিয়েছেন নিজের জীবনের বিশেষ দিনটি নিয়ে তার অনুভূতির কথা। সেইসঙ্গে একজন মুসলিম হিসেবে রোজা, ইফতার, সেহরি নিয়েও বলেছেন অনেককিছু।
জন্মদিন কেমন কাটছে?রাশেদ সীমান্ত : আমি কখনো জন্মদিন বিশেষভাবে পালন করি না। এই দিনটি পরিবারের সাথে কাটাতেই সবচাইতে স্বাছন্দ্য বোধ করি। জন্মদিন মানেই আমার কাছে জীবন থেকে আরেকটি বছর কমে যাওয়া এবং মৃত্যুর দিকে আর একটু বেশি এগিয়ে যাওয়া। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি, সুন্দরভাবে আরো একটি বছর অতিক্রম করলাম। যতদিন বেঁচে আছি যেন সুস্থ থাকি, মানবকল্যাণে নিজেকে কাজে লাগাতে পারি। আমার এবং পরিবারের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।
প্রথম রোজা রাখার স্মৃতি মনে পড়ে?রাশেদ সীমান্ত : স্মৃতি আমার তেমন করে মনে নেই। তবে এটা মনে আছে, প্রথম দিকে যখন রোজা রাখতাম মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে খাবার খেতাম। রোজা তখনও ফরজ হয়নি। কিন্তু বাসার সবাই চাইতো যেন রোজা রাখার অভ্যেসটা হয়। এজন্য রাখতে বলতো। আমিও রাখতাম। কিন্তু মাঝেমাঝে লুকিয়ে খাবার খেয়ে নিতাম। কেউ কিছু টের পেতো না। সবাই জানে আমি রোজা। ইফতার করতাম যথাসময়ে। এমন ভাব করতাম যে, ‘হ্যাঁ, সারাদিন খুব কষ্ট হয়েছে রোজা রাখতে।’ অনেকে বাহবা দিতো। ভাবতো ছোট মানুষ, কি সুন্দর রোজা রাখছে। সবাইকে বোকা বানিয়ে আমিও মজা পেতাম। হা হা হা.... কিন্তু পরবর্তীতে বড় হয়ে বুঝছি যে কাজটা ঠিক হয়নি। বড় হবার পর এটা নিয়ে অপরাধবোধ কাজ করতো। পরে উপলব্দি হয়েছে যে ছোটবেলার ব্যাপারগুলোই তো আসলে ফ্যান্টাসিতে ভরপুর। কাজটা ঠিক হয়নি সেটা ভাবতে পারাই বড় কথা।
শৈশব-কৈশোরের রোজা, ইফতার ও সেহরী নিয়ে অনেক স্মৃতি নস্টালজিক করে অনেককে৷ আপনারও কোনো মজার স্মৃতি আছে নিশ্চয়ই?রাশেদ সীমান্ত : ছোটবেলার রোজার স্মৃতি ভাবলেই মনে আসে শীতকালের সেইসব রোজার কথা। স্মৃতির কি আর শেষ আছে। অগুনতি সময়, মুহূর্ত নস্টালজিক হয়ে আছে। অনেক মানুষ চলে গেছে, দিন রাত হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে, স্মৃতিরা আছে অমলিন। মনে আছে, আমি যখন বুঝতে শিখেছি তখন দেখতাম প্রচণ্ড শীতের মধ্যে রোজা আসতো। তখন সেহরি খেয়ে ফজর নামাজের পর সবাই মিলে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। সূর্য উঠা পর্যন্ত চলতো খেলা। স্কুল বন্ধ থাকায় বড়রাও পড়া নিয়ে তাগদা দিতেন না। সেই খেলা ও মানুষগুলোকে খুব মিস করি। ছোটবেলায় দলবেঁধে মসজিদে যাওয়া, তারাবি ও ফজরের নামাজ আদায় করার স্মৃতিগুলোও বারবার ফিরে ফিরে আসে।
শৈশব ও বড়বেলার রোজার মধ্যে কী পার্থক্য পান?রাশেদ সীমান্ত : হ্যাঁ, শৈশব এবং বড়বেলার রোজার মধ্যে অনেক পার্থক্য পাই। শৈশবে আসলে রোজাটা যখন রাখতাম তখন এটা আমার কাছে খুবই গর্বের একটা বিষয় মনে হতো। যেদিন রোজা রাখতাম ওইদিন সবাইকে ডেকে ডেকে বলতাম, ‘আমি কিন্তু রোজা।’ মানে রোজার বিষয়ে কোনো কথাই হয়তো হচ্ছে না সেখানে কিন্তু আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই প্রসঙ্গই টেনে আনতাম। চেষ্টা করতাম সবাইকে জানাতে যে আমি রোজাদার। এবং এটা খুব গর্বের সাথে বলতাম। আসলে তখন রোজা রাখাটা একটা শক্তি-সামর্থ ও বীরত্বের ব্যাপার বলে মনে হতো। কিন্তু এটা তো মুসলিম হিসেবে আমার জন্য বাধ্যতামূলক। বড় হয়ে এই ভাবনাগুলোর পরিবর্তন এসেছে। এখন চেষ্টা করি মন দিয়ে রোজাগুলো পালন করতে, নামাজ ও ইবাদাতে মশগুল থাকতে।
রমজানে সব মুসলমানই অন্য সময়ের চেয়ে একটু বিশেষ মেন্যু পছন্দ করে। সাধারণত সেহরী বা ইফতারে আপনার পছন্দের খাবার কি?রাশেদ সীমান্ত : আমার আসলে সেহরি বা ইফতারে আলাদা বিশেষ কোনো খাবারের মেন্যু নেই। ঘরে যখন যেটা পাই খেয়ে নিই। সবাইকে নিয়ে সেহরি বা ইফতারে বসতে পারাটাই আমার কাছে আনন্দের। আমি চেষ্টা করি রোজার মাসে পরিবারের সঙ্গে এই মুহূর্তগুলো কাটাতে। খাবার বেলায় এমনিতে ভাজা পোড়া খুব একটা খেতে ভালো লাগে না তবে ঝাল জাতীয় খাবার ও ভর্তা খেতে পছন্দ করি। রোজার সময় সেহরি বলেন বা ইফতার; আমি ঝাল জাতীয় খাবার খুঁজি। সঙ্গে কিছু একটা ভর্তা হলে বেশ জমে যায় আরকি।
এবারের সংযম ও পবিত্রতার রোজায় আপনি যে বার্তা দিতে চান সবার জন্য?রাশেদ সীমান্ত : আমি মনে করি মুসলিমদের জন্য মানবিকতা, সম্প্রীতি, ন্যায়, ইবাদতে ইনভেস্টমেন্ট করার সবচাইতে বড় সময় এই রমজান। কারণ কোরান ও হাদিস সব জায়গায় রোজার মাকে অন্য ১১টি মাস থেকে আলাদা করা হয়েছে। কারণ এই মাসে আপনি যা দান করবেন তার রিটার্ন অন্য যেকোনো সাধারণ মাস থেকে অনেক অনেক বেশি। ইবাদতের জন্যও তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে মাসটিকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা এই ব্যাপারগুলো নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবি না। সেজন্যই দেখা যায় রোজা শুরু হলেও আমাদের দেশের মানুষের নীতি নৈতিকতার কোনো পরিবর্তন আসে না।রোজা আসলেই আমাদের ব্যবসায়ীদের মধ্যে মূল্য বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে! মানুষকে জিম্মি করে মুনাফা কামায় তারা। ধরুন আমি যে বাড়ি যাব আমার বাবা মার কাছে, এইটা আমার ইমোশন। আমি আমার বাবা, মা, আত্মীয় স্বজন, সন্তানকে দেখব। তো আমার ইমোশনকে নিয়ে যখন জিম্মি করে অনেকেই বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দেয়, অনেক পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দেয় সেটা তখন কেমন লাগে?একজন দরিদ্র মানুষ হয়তো পরিবারে জন্য কেনাকাটা করতে গেছেন একটা বাজেট সাজিয়ে। বাজারে গিয়ে দেখলেন সবকিছুর দাম নাগালের বাইরে। সেই লোকটার অসহায়ত্বের কথা ভাবলেই বুক কেঁপে উঠে। একটা গার্মেন্টসের লোকের কথা ভাবুন, একজন রিক্সাওয়ালা ভাই বা নিম্ম আয়ের যে কোনো মানুষ রোজা শুরু থেকে ঈদ করে আবার কর্মস্থলে ফেরা পর্যন্ত নানাভাবে জিম্মি হয়! আমি চাই সবার মনের পরিবর্তন হোক। সবার চিন্তাগুলো সুন্দর হোক। মানবিকতা ও হৃদয়ের সৌন্দর্য প্রকাশ হোক। এটাই আমার বার্তা বা প্রত্যাশা।
এলআইএ