বাংলা ভাষা, বাঙালি, মাতৃভাষা-শব্দগুলো উচ্চারণ করলেই সামনে চলে আসে বাঙালি জাতির ত্যাগ, সংগ্রাম, আন্দোলন, রক্ত, বজ্রকন্ঠ, সাহস আর অজস্র ইতিহাস। বাংলা ভাষা মাতৃভাষা করার জন্য এ জাতিকে জীবন দিতে হয়েছে। করতে হয়েছিল আন্দোলন। যাকে ‘ভাষা আন্দোলন’ নামেই ইতিহাসের পাতায় যুক্ত করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস উচ্চারণ করলেই আমাদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে শহীদদের নাম, ভেসে ওঠে রাজপথের রক্তাক্ত স্মৃতি, আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে শহীদ মিনারের সাদা স্তম্ভ।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন শুধু শহীদদের রক্তে লেখা নয়; এটি লেখা নারীদের সাহস, সংগঠনশক্তি ও আত্মত্যাগে। তারা প্রমাণ করেছিলেন জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে সংগ্রাম কখনো একক লিঙ্গের নয়; নারী-পুরুষ একসঙ্গে লড়াই করলেই ইতিহাস তৈরি হয়। কিন্তু ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা একটি শক্তিশালী অধ্যায়-নারীদের অবদান অনেকেই জানেন না কিংবা খুব বেশি আলোচনা করেন না। সেসময় নারীরা এখনকার মতোই শুধু দর্শক ছিলেন না, ছিলেন সংগ্রামের সহযোদ্ধা; কখনো কলমে, কখনো কণ্ঠে, কখনো মিছিলে, আবার কখনো সংগঠনের নীরব স্থপতি হয়ে। যেভাবে নারীদের আমরা এসময়ের বিভিন্ন আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে দেখি।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনা নেয়, তখন পূর্ববাংলার মানুষের মনে জন্ম নেয় ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের ঢেউ শুধু ছাত্রসমাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ধীরে ধীরে তা পৌঁছে যায় নারীসমাজেও। সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতা ছিল কঠোর রক্ষণশীল; নারীদের ঘরের বাইরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া ছিল প্রায় অকল্পনীয়। তবু ভাষার প্রশ্নে তারা এই সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসেন।
প্রথমে তারা কলমকে অস্ত্র বানান। নারীদের মুখপত্র বেগম পত্রিকা হয়ে ওঠে ভাষা সচেতনতার এক শক্তিশালী মাধ্যম। মোহেসনা ইসলাম, আফসারুন্নেসা, রুকিয়া আনোয়ারদের মতো লেখিকারা প্রবন্ধ, চিঠি ও সম্পাদকীয়র মাধ্যমে ভাষার অধিকারকে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। এই লেখালেখিই ছিল আন্দোলনে নারীদের প্রথম সংগঠিত পদচারণা।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যখন বিশিষ্টজনেরা স্মারকলিপি পেশ করেন, তখন তাতে নারীদের স্বাক্ষর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আনোয়ারা খাতুন, লিলি খান, লীলা রায়, রুকিয়া আনোয়ারদের নাম সেই তালিকায় যুক্ত হয়ে প্রমাণ করে ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকেই নারীরা ছিলেন সক্রিয় অংশীদার। ভাষা আন্দোলনের তৎপরতা ছড়িয়ে দেওয়ায় নাদিরা বেগম ও শাফিয়া খাতুন অন্যতম ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন সফল করার ক্ষেত্রে বেগজাদী মাহমুদা নাসির, মমতাজ বেগম, মালেকা, সুলতানা রাজিয়া আফরোজা, খালেদা খানম প্রমুখের অবদান অনস্বীকার্য।
১৯৪৮ সালের ধর্মঘট ছিল নারীদের সরাসরি রাজপথে নামার প্রথম বড় পরীক্ষা। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একদল ছাত্রী পুলিশের বাধার মুখে পড়েন; আহত হন অনেকে। বিভিন্ন ভাষা আন্দোলনভিত্তিক গবেষণা ও স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীদের বড় অংশই ছিল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তারা ধর্মঘট সংগঠিত করা, লিফলেট বিতরণ, মিছিল পরিচালনা, সভা আয়োজন সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দেয়।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তাল সময়। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও রাস্তায় নেমে আসেন। সুফিয়া ইব্রাহিম, শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন্নাহার ও সারা তৈফুরের মতো ছাত্রী দলবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানান। পুলিশের গুলিবর্ষণের পর তারা বিভিন্ন স্থানে সভা করে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান। আজিমপুর কলোনির নারীদের প্রতিবাদসভায় কয়েক হাজার নারী একত্রিত হয়ে সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতেও নারীরা ছিলেন অপরিহার্য। আহতদের চিকিৎসা ও আন্দোলনের খরচ জোগাতে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করতেন। এক ভাষাসৈনিকের স্মৃতিচারণে জানা যায়, ছাত্রীদের দল ভোরে বের হয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের সমর্থন সংগ্রহ করতেন এবং প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছাত্রদের জন্য সহানুভূতি পেতেন।
জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদের স্মৃতিতে উঠে আসে তারা কয়েকজন বকশীবাজার, উয়ারি প্রভৃতি এলাকায় গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলেন। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নারীরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পাকিস্তান আমলে নারীদের সামাজিক অবস্থান ছিল সীমাবদ্ধ; শিক্ষা ও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ ছিল কম। তবুও তারা সংগঠন গড়ে তুলে আন্দোলনে যুক্ত হন। ইতিহাসবিদদের মতে, নারীরা যদি এই আন্দোলনে অংশ না নিতেন, তবে আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি এত বিস্তৃত হতো না। কারণ নারীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে পরিবারভিত্তিক সমর্থন এনে দেয় এবং জনমতের চাপ বহুগুণ বাড়ায়।
ভাষা আন্দোলন শুধু একটি ভাষার দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম বড় রাজনৈতিক জাগরণ। পরবর্তী শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ সব ক্ষেত্রেই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতাই নারীদের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস গড়ে দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধে তাদের অসামান্য ভূমিকার ভিত্তি তৈরি করে।
ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় যখন ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে ভাষার জন্য জীবনদানকারী মানুষের সংগ্রাম বিশ্বমানবতার ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদা লাভ করে। ভাষার নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরল উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে। যে স্বীকৃতি, ইতিহাস আর কোনো জাতির নেই।
তথ্যসূত্র: সেলিনা হোসেন সম্পাদিত ‘ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও স্মারক’ গ্রন্থ, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, দ্য কন্ট্রিবিউশন অব ইউম্যান ইন দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ মুভমেন্ট(১৯৫২): অ্যা হিস্টোরি অ্যানালাইসিস, ব্রিটিশ জার্নাল অব আর্টস অ্যান্ড নিউম্যানিটিস
আরও পড়ুন‘বাংলিশ’ ভাষার দূষণ নাকি সময়ের বিবর্তন?সামাজিক মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকৃতি নিয়ে কি ভাবছেন তরুণরা?
কেএসকে