১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই যশোরে ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দিলেও কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই আন্দোলনমুখর ঘটনাপ্রবাহ। গৌরবোজ্জ্বল এই ইতিহাস সংরক্ষণে নেই কোনো সরকারি উদ্যোগ, ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে যাচ্ছে যশোরের ভাষা সংগ্রামের বীরত্বগাথা।
যশোরের ভাষা আন্দোলনের গবেষক কবি সাইদ হাফিজের মতে, ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে ঢাকার আগে যশোরে প্রথম আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় বাংলা ভাষাবিরোধী একটি লেখার প্রতিবাদে মাইকেল মধুসূদ (এম.এম) কলেজের ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হামিদা রহমান একটি পত্র লেখেন। ১০ জুলাই ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। এর মধ্য দিয়েই যশোরে ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়। তখনও ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি।
‘যশোরের ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থে প্রয়াত কবি ও খ্যাতিমান সাংবাদিক ফখরে আলমও এই তথ্য উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘বিচারপতি কেএম সোবহান ১৯৮৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ‘সংবাদে’ প্রকাশিত ‘একুশের চিন্তা’ প্রবন্ধে হামিদা রহমানের এই চিঠি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত বলা যায় এখান থেকেই।’
১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের (এমএম কলেজের পুরাতন হোস্টেল) এলভি মিত্র হলে সভা করে ঢাকার ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর মতো যশোরে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ মার্চ এম.এম. কলেজে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ৭ মার্চ পুনরায় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মার্চ-এর কেন্দ্রীয় ছাত্র ধর্মঘটের সমর্থনে যশোরে ৮ ও ৯ মার্চ মিছিল মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ১০ মার্চ জেলা প্রশাসক শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন। ছাত্র নেতৃবৃন্দ কলেজে জরুরি বৈঠক করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও মিছিল মিটিং করার আহ্বান জানান। ১১ মার্চ শহরে মিছিল ও ধর্মঘট পালিত হয়। সেই দিনই পুলিশ ৩৪ জন নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করেন।
‘যশোরের ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থে কবি সাংবাদিক ফখরে আলম লিখেছেন, ১১ মার্চ বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু পিটিআই, যশোর জিলা স্কুল ও মোমিন গার্লস স্কুলের শিক্ষার্থীরা ছাত্র ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করতে চাইলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানরা বাধা দেয়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সকালে মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এক পর্যায়ে মিছিলটি মোমিন গার্লস স্কুলে আসে। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার আহম্মেদ সিদ্দিকী, সৈয়দ আফজাল হোসেন, হামিদা রহমান। মোমিন গার্লস স্কুলে লেখাপড়া করতো ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ইএ নোমনীর মেয়ে। সে শিক্ষার্থীদের ধর্মঘটে যোগ দিতে বাধা দিয়েছিল। হামিদা রহমান বীরদর্পে স্কুলে ঢুকে নোমানীর মেয়েকে সিঁড়ির উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। তার ঠোঁট কেটে রক্ত ঝরে পড়ে। এমনকি একটি দাঁতও ভেঙে যায়।
এদিন রাতে যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পুলিশের ধড়পাকড় আর হুলিয়া থাকার কারণে সংগ্রাম পরিষদের বেশির ভাগ নেতৃবৃন্দ এই সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। সন্ধ্যা সাতটার পর অনুষ্ঠিত সভায় বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের নেতারা ভয়ে উপস্থিত হননি। তবে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ডা. জীবন রতন ধর ও যুগ্ম-আহ্বায়ক হামিদা রহমান, আফসার আহম্মেদ সিদ্দিকীসহ আরো কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
যশোরের অন্যতম ভাষাসংগ্রামী হামিদা রহমান তার ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে কলেজের বেয়ারা কেশবচন্দ্রের সাহায্যে পাজামা-শার্ট পরে এবং মাথায় গামছা বেঁধে, হাতে বিড়ি নিয়ে ছদ্মবেশে তিনি কলেজ ত্যাগ করেন। সেই রাতে পুলিশ যখন তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে, তখন তার দাদী নূরু বিবি পুলিশকে ঝাঁটা দিয়ে তাড়া করেছিলেন।
এই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ১৩ মার্চ যশোরের ইতিহাসে এক রক্তঝরা দিন। ওই মিছিলে প্রায় ৩ হাজার মানুষ অংশ নেন। ১৩ মার্চ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি যশোরের সব শ্রেণি পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সকাল ১০টায় যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এই মিছিলে সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীরাও যোগ দেন। মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ করে চৌরাস্তা থেকে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় যশোর কালেক্টরেট ভবনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে দড়াটানায় পুলিশ বাঁধা দেয়।
যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি আব্দুল জব্বারের নেতৃত্বে পুলিশ মিছিলের ওপর হামলা চালায়। বেধড়ক লাঠিচার্জ করে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু সংগ্রামী ছাত্র-জনতা একত্রিত হয়ে পুলিশের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশের উপর ইট-পাটকেল ছোড়ে। ছাত্রদের সহযোগিতার জন্য রিকশাওয়ালা, শ্রমিক, দোকানদাররা এগিয়ে আসেন। তারাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়েন।
এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ডা. জীবন রতন ধর, আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার আহম্মেদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কালেক্টরেট ভবনে ঢুকে জানালা, দরজা ভাঙচুর করে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ইএ নোমানীর অফিসেও হামলা চালায়। ছাত্রদের ইটের আঘাতে আহত হন ওসি আব্দুল জব্বার। কোতোয়ালি থানার দারোগা ফামউদ্দিনের মাথা ফেটে যায়। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো শুরু করে। গুলিতে সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক আলমগীর সিদ্দিকী আহত হন। তার পায়ে গুলি লাগে। ১৩ মার্চ পুলিশের গুলি চালানোর এই ঘটনাটি ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর প্রথম গুলি বর্ষণের ঘটনা। এই গুলিবর্ষণের ঘটনায় পুরো যশোর শহর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পুলিশও বেপরোয়া হয়ে নির্যাতন চালানো শুরু করে। এসবের প্রতিবাদে ১৪ মার্চ শহরে আবার হরতাল পালিত হয়। এরপর লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যশোরে প্রায় পনেরো হাজার লোকের অংশগ্রহণে প্রায় দেড় মাইল লম্বা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ সাত দশকেও এসব স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এম.এম কলেজের সেই পুরোনো হল আজ ধ্বংসস্তূপ। যশোরের ভাষা আন্দোলনের গবেষক ও কবি সাইদ হাফিজ আরও বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যশোরের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি একে একে মুছে যাচ্ছে। যশোরের ভাষা সৈনিকেরা আজও অবধি কোনো স্বীকৃতি পাননি এবং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, যশোরে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত যশোর সরকারি এম.এম. কলেজ, যশোর’র পুরাতন ভবন সংস্কার করে ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
যশোরের ভাষা আন্দোলনের মিছিলে সংগ্রামে অংশ নেওয়া কলামিস্ট আমিরুল ইসলাম রন্টু বলেন, ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসটি পেছনে পড়ে যাচ্ছে। এই ইতিহাসের চর্চা ও গবেষণা না থাকায় নতুন প্রজন্ম তা জানতেও পারছে না।
মিলন রহমান/কেএইচকে/এমএস