ভ্রমণ

রৌমারি থেকে নদীর তীর ধরে হেঁটে চর কুকরি মুকরি

মাসফিকুল হাসান টনি। কুড়িগ্রামের রৌমারি থেকে নদীর তীর ধরে ভোলার চর কুকরি মুকরি পায়ে হেঁটেছেন। ১৮ দিনের দীর্ঘ যাত্রায় তিনি অতিক্রম করেছেন ৬৩০ কিলোমিটার পথ। ৬ বিভাগের ১২ জেলায় ছুঁয়ে দেখেছেন নদীর কান্না; শুনেছেন জনপদের মানুষের প্রত্যাশা। এই পরিব্রাজকের সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্প লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ—

নদীর অববাহিকার অবনতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং জীবাশ্ম জ্বালানি বিস্তারের প্রতিবাদ জানাতে ব্যতিক্রম এই একক অভিযান শুরু করেছিলেন টনি। যার সূচনা হয় কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলার ডিগ্রির চর থেকে। এখান থেকেই শুরু হয় টনির এক দীর্ঘ এক্সপ্লোরেশন—নদীর ধার ধরে এমন এক রুট খোঁজা, যা মানচিত্রেও স্পষ্ট নয়।

টনি জানালেন, রুট প্ল্যান করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। নদীর পাড় ধরে আদৌ হাঁটার পথ আছে কি না, তা নিশ্চিত ছিল না। গুগল ম্যাপ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বিকল্প পথ দেখালেও বাস্তবে সেই পথ ছিল অনিশ্চিত। ফলে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা আর নিজের পর্যবেক্ষণ শক্তিই ছিল শেষ ভরসা। আমার লক্ষ্য ছিল শুধু নদীর ধারে হাঁটা নয়—নদীঘেঁষা জনপদে বসবাসকারী মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও বাস্তবতা কাছ থেকে জানা।

দীর্ঘ ১৮ দিনের এই অভিযানে টনি ছুঁয়েছেন ৬ বিভাগের ১২টি জেলা। এর মধ্যে ছিল কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুরের অংশবিশেষ, শরীয়তপুর, বরিশাল ও ভোলা জেলা।

আরও পড়ুনএভারেস্টের গল্প হাতে ঘুঘুডাঙার পথে পথে 

টনি বললেন, যমুনা, পদ্মা ও মেঘনার অসংখ্য চর পেরিয়ে নদীভাঙন, শুকনো চ্যানেল আর হঠাৎ বদলে যাওয়া পথের মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার। অনেক জায়গায় নদীর চ্যানেল পুরোপুরি শুকনো—সেখানে চাষ হচ্ছে সরিষা, বাদাম ও শাক-সবজি। আবার কোথাও হাঁটুসমান কাদা পেরিয়ে, কোথাও নৌকায় পার হতে হয়েছে খাল ও ছোট নদী। প্রায় ১৫টির বেশি খাল পার হতে হয়েছে নৌকা বা হেঁটে। অনেক মাঝি ও খেয়াঘাটের মানুষ অতিথি হিসেবে সম্মান জানিয়ে বিনা ভাড়ায় পার করে দিয়েছেন—এই নিঃস্বার্থ আতিথেয়তা অভিযানের অন্যতম প্রাপ্তি।

এই অভিযানে ছায়াসঙ্গীও পেয়েছেন টনি। শুরুর দিকে পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল ও শাহনাজকে সঙ্গে পেয়েছেন। টাঙ্গাইল অতিক্রমের পথে আরেক সঙ্গী শামীম সাব্বিরের সঙ্গ পেয়েছেন। ভোলার পথে পথে পেয়েছেন কাছের বন্ধু জয়নব তুসিকে।

নদীর তীর ধরে হাঁটতে গিয়ে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে টনিকে। কখনো ভূতের বাংলা, কখনো দুষ্টুচক্রের ফাঁদে আবার কখনো গুপ্তচরের অ্যাখ্যাও পেতে হয়েছে এই পরিব্রাজককে। টনি বলছেন, শরীয়তপুরের মাঝিরকান্দি এলাকায় তিনজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির দ্বারা হয়রানির শিকার হন তিনি। পরিস্থিতি জটিল হলে দৌড়ে একটি স্কুলে আশ্রয় নেন। তবে স্থানীয় শিক্ষকদের সহযোগিতায় নিরাপদে বেরিয়ে আসেন। আবারও অভিযান শুরু করেন।

তিনি জানালেন, শরীয়তপুরের সখীপুর এলাকায় ভুল বোঝাবুঝিতে ‘ভূতের ডাকবাংলো’ পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমি শরীয়তপুরের সখীপুরের ইউএনওকে টেলিফোন না করে ভুল করে টাঙ্গাইলে ফোন দিই। তো উনি আমাকে ডাকবাংলোতে থাকার ব্যবস্থার কথা নিশ্চিত করেন। তখন বাজে রাত সাড়ে ৯টা। কিন্তু আমি তো তখন ছিলাম শরীয়তপুরে। তাড়াহুড়োয় কিছু যাচাই না করে একটা পরিত্যক্ত ভূতের ডাকবাংলোয় পৌঁছে যাই। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক যুবকের সহায়তায় নিরাপদ আশ্রয় মেলে।

আরও পড়ুনসবুজের রাজ্য শ্রীমঙ্গল থেকে ঘুরে আসুন 

টনির এই যাত্রার উদ্দেশ্যেই ছিল নদীর অববাহিকার অবনতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং জীবাশ্ম জ্বালানি বিস্তারের প্রতিবাদ। আর এক কারণে এই যাত্রায় নদীভাঙন, মাছের সংকট, চরবাসীর জীবনযাপন, কৃষি উৎপাদন—নদী জনপদের মানুষের মুখেই সবকিছু জানার চেষ্টা করেছেন। কোথাও কৃষকের সঙ্গে নদীর পাড়ে বসে আমন চালের ভাত, কোথাও জেলেদের সঙ্গে রিটা ও পোয়া মাছের ঝোল—এই খাবারগুলো স্বাদ তার কাছে হয়ে ওঠে ফাইভ স্টারের চেয়েও মূল্যবান অভিজ্ঞতা।

নদী দেখতে বেরিয়ে টনির অন্য এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। তার ভাষ্যে, বাজারে বা মাছের আড়তে গেলেই অনেকে সন্দেহ করতেন—তিনি সরকারি লোক বা সাংবাদিক কি না। বিশেষ করে জাটকা ইলিশ বিক্রির কারণে ভিডিও করতে বাধা দেওয়া হতো। এসব বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও এর সংকট। সব বাধা, ভয়, ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত টনির যাত্রা শেষ হয় ভোলার চর কুকরি মুকরিতে।

৬৩০ কিলোমিটারের এই হাঁটা শুধু এক অভিযাত্রীর কৃতিত্ব নয়—এ এক অনন্য দলিল। যেখানে নদী, চর আর মানুষের জীবন এক সুতোয় গাঁথা। নদীর পাড় ধরে হাঁটার এই গল্প বাংলাদেশের ভ্রমণ ও পরিব্রাজন ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

এসইউ