দেশজুড়ে

নৌযান চালকদের গলার কাঁটা পুরোনো সেতুর ডুবো পিলার

শরীয়তপুরের আংগারিয়ায় কীর্তিনাশা নদীর তলদেশে পুরাতন সেতুর পিলার অপসারণ করা হয়নি। এতে পানির নিচে ডুবে থাকা পিলারের ধাক্কায় মাঝেমধ্যে তলা ফেটে ডুবে যাচ্ছে মালবাহী নৌযান। গত আট বছরে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে কমপক্ষে ৪০টি মালবাহী নৌযান। এতে কয়েক কোটি টাকার লোকসান হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন ঘটনা বারবার ঘটলেও পুরাতন পিলার সরাতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

স্থানীয় ও সড়ক বিভাগ সূত্র জানায়, শরীয়তপুরের মধ্যদিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মার শাখা নদী কীর্তিনাশা। এ নদী দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নৌযানগুলো পদ্মায় বের হয়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর অভিমুখে চলাচল করে। নদীটির সদর উপজেলার আংগারিয়া এলাকায় একটি সেতুর মাধ্যমে যুক্ত করেছে মাদারীপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক। শুরু থেকে ওই স্থানে একটি বেইলি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। সড়ক সম্প্রসারণের কাজ ও বেইলি সেতুটি পুরাতন হয়ে যাওয়ায় ২০১৫ সালে জাইকা প্রজেক্টের মাধ্যমে ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৫ মিটার দৈর্ঘ্যের নতুন সেতুটি নির্মাণ কাজ শুরু করে সড়ক বিভাগ। তিন বছর কাজ শেষে ২০১৮ সালে যানবাহন চলাচলের জন্য সেতুটি উন্মুক্ত করা হয়। তবে নতুন সেতু চালু হলেও পুরাতন বেইলি সেতুর পিলারগুলো অপসারণ করা হয়নি। এতে নদীপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। গেল কয়েক বছরে শুধু এই স্থানে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে অন্তত ৪০টি নৌযান। আর এতে লোকসান হয়েছে কয়েক কোটি টাকার। অতি দ্রুত পানির তলদেশে থাকা পুরাতন পিলারের অংশ কেটে অপসারণের দাবি স্থানীয়দের।

বিল্লাল মোল্লা নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ব্রিজ নির্মাণের পর পুরাতন ব্রিজের পিলার সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার অপসারণ করেনি। এ পুরাতন পিলার নৌযানের তলায় লেগে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা হচ্ছে। নৌযান ডুবে প্রতিবছর পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দাবি, অতি দ্রুত এ পুরাতন পিলার সরানোর ব্যবস্থা করা হোক। নয়তো আমরা বাধ্য হয়ে এ নৌপথ বন্ধ করে দেব।

মোহাম্মদ শাহেদ নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দক্ষিণবঙ্গের অনেক জাহাজ শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদী হয়ে চলাচল করে। আর এ নদীর আংগারিয়া ব্রিজের নিচে প্রতি সপ্তাহে একটি করে দুর্ঘটনা ঘটে। সরকার যেন অতি দ্রুত পুরাতন পিলার সরিয়ে নেয়।

গেল পরশু খুলনার দাকোপ থেকে তিন হাজার বস্তা ধান নিয়ে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ‘মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি মালবাহী বড় নৌযান। নৌযানটি শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীর আংগারিয়া ব্রিজের নিচে পৌঁছালে তলদেশে থাকা পুরাতন পিলারে ধাক্কা লাগে। কিছু বুঝে ওঠার আগে হঠাৎ করে তলা ফেটে পানি প্রবেশ শুরু করে। এতে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ টাকার ধান নিয়ে নিমিষে পানিতে তলিয়ে যায় নৌযানটি। কিছু ধান অন্য একটি নৌযানের সাহায্যে তোলা হলেও অধিকাংশ ধানের বস্তা এখন পানির নিচে। এ ঘটনায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও নৌযান মালিক সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মুকুল শেখ বলেন, আমি খুলনা থেকে ধান কিনে সেগুলো নারায়ণগঞ্জে বিক্রির উদ্দেশ্যে জাহাজযোগে পাঠিয়েছিলাম। পরে সেটি শরীয়তপুরের আংগারিয়া এলাকার ব্রিজের নিচের পুরাতন পিলারে লেগে ডুবে যায়। জাহাজটিতে আমার ১ কোটি ১০ লাখ টাকার মাল ছিল। কিছু মাল তুলতে পারলেও অধিকাংশ মাল এখনো পানির নিচে। আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল।

ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানের মালিক রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমরা সব সময় সেতুর দুই পিলারের মাঝ বরাবর যাওয়ার চেষ্টা করি। আংগারিয়া এলাকায় দুই পিলারের মাঝে এখনো পুরাতন পিলার রয়ে গেছে। সেই কারণে আমার জাহাজের তলা ফেটে ডুবে গেছে। এতে আমার দুই লাখ টাকার ভাড়াসহ অন্তত জাহাজ আগের মতো করতে ১০ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছি। এর দায়ভার অবশ্যই যারা সেতুর দায়িত্বে ছিলেন তাদের। যদি পুরাতন সেতুর পিলার সরানো হতো তাহলে আজ এ দুর্ঘটনা ঘটত না। আমরা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানাই।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তলা ফেটে ব্রিজের ঠিক নিচে ডুবে আছে ‘মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি বড় মালবাহী ট্রলার। ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে ডুবুরি দিয়ে ধানের বস্তা তুলে আনছেন শ্রমিকরা। পরে সেগুলো মাথায় ও বাঁশের ভারে করে আরেকটি ট্রলারে লোড করা হচ্ছে।

প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটার পরও তেমন টনক নড়েনি সড়ক ও জনপদ বিভাগের। ব্যবস্থা নেওয়ার দায়সারা বক্তব্য দিয়েছেন জেলা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন। তিনি বলেন, বিষয়টি আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি। পুরাতন স্থাপনা থেকে থাকলে তা আমরা সরানোর ব্যবস্থা করব। এটি যত দ্রুত সম্ভব করা হবে।

বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজর এড়ায়নি জানিয়ে পিলার সরাতে সড়ক বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম। তিনি বলেন, ওই স্থানে বিগত সময়ে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা হয়েছে বলে দেখেছি, শুধু সেতুর পুরাতন ধ্বংসাবশেষ থাকার কারণে।

আমাদের সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে পিলার সরাতে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দিয়েছি।

বিধান মজুমদার অনি/আরএইচ/জেআইএম