বাঙালির ইফতার মানেই ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, খেজুর, জিলাপিসহ নানান ভাজাপোড়া খাবারের সমারহ। তবে এর পাশাপাশি ফল, ফলের রস, শরবত তো থাকেই। অনেকে ইফতারিতে খিচুড়ি। তেহারি খেয়ে থাকেন। এছাড়া পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতারে আছে আরও বেশকিছু চমকপ্রদ আইটেম, যেমন-বড় বাপের পোলায় খায়, বোরহানি, কাবাব, বুটের ডাল, বিরিয়ানিসহ নানান মুখরোচক খাবার।
তবে বাঙালিদের ইফতারে ছোলা, মুড়ি এ যেন এক অবিচ্ছেদ্য জুটি। তবে এই খাবার যুগল কীভাবে ইফতারের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠলো? এটি কি শুধুই অভ্যাস নাকি এর পেছনে আছে কোনো ইতিহাস? চলুন আজ সেটাই খুঁজব। এই ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় উপমহাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে।
ইসলামে রোজা ভাঙার সুন্নত পদ্ধতি হলো খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় আরব অঞ্চলে খেজুর ছিল সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাদ্য। ইসলাম যখন ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে বিশেষ করে সুলতানি ও মোঘল আমলে তখন স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মীয় অনুশীলনের এক স্বাভাবিক মেলবন্ধন ঘটে। আরবের খেজুরের পাশাপাশি এখানকার সহজলভ্য শস্য ও ডাল ইফতারের অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলা অঞ্চলে ধান ছিল প্রধান ফসল। সেই ধান থেকে তৈরি মুড়ি গ্রামীণ জীবনে বহু আগে থেকেই জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী খাবার। ঐতিহাসিক খাদ্যসংস্কৃতি গবেষণায় দেখা যায়, মুড়ি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার দৈনন্দিন খাদ্যের অংশ বিশেষত কৃষিজীবী সমাজে। এটি হালকা, সহজপাচ্য এবং সংরক্ষণযোগ্য হওয়ায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরের জন্য উপযোগী। ফলে রোজা ভাঙার সময় মুড়ি একটি স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে ছোলা উপমহাদেশে বহু শতাব্দী ধরে চাষ হয়ে আসছে। মোঘল আমলে বিভিন্ন ডাল ও মসলা নির্ভর খাবারের বিস্তার ঘটে। ছোলা সেদ্ধ বা ভেজানো অবস্থায় প্রোটিনসমৃদ্ধ ও পুষ্টিকর হওয়ায় ইফতারের জন্য তা উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে উনিশ ও বিংশ শতকে শহুরে মুসলিম সমাজে ইফতারের তালিকায় ছোলা-ভিত্তিক খাবারের প্রচলন বাড়তে থাকে।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় ইফতারের একটি বড় রূপান্তর ঘটে ঔপনিবেশিক আমলে। ব্রিটিশ শাসনামলে শহরকেন্দ্রিক বাজারব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং রমজানকে ঘিরে বিশেষ খাদ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে। কলকাতা ও ঢাকার মতো শহরে ইফতার বাজারে ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি ইত্যাদির বিক্রি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এটি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে ছোলা ও মুড়ি ছিল তুলনামূলক কম দামের, পুষ্টিকর ও সহজলভ্য।
পুষ্টিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীরে দ্রুত শক্তি জোগাতে কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন প্রয়োজন হয়। মুড়ি কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে, আর ছোলা প্রোটিন ও ফাইবার দেয় এই পুষ্টিগত সমন্বয়ও এর জনপ্রিয়তার একটি কারণ হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রাচীন ধর্মীয় নির্দেশনা নেই, তবে সামাজিক অভ্যাস ও উপযোগিতার ভিত্তিতে এটি গড়ে উঠেছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।
বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদদের মতে, ইফতারের ছোলা-মুড়ি মূলত স্থানীয় কৃষিনির্ভর সমাজ, সহজলভ্য উপকরণ এবং ধর্মীয় অনুশীলনের সমন্বয়ে তৈরি এক ঐতিহ্য। এটি আরব সংস্কৃতি থেকে সরাসরি আমদানি নয়; বরং ইসলামি অনুশীলনের সঙ্গে বাঙালির নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির অভিযোজন।
আজকের দিনে ইফতারের টেবিলে নানা আধুনিক খাবার যুক্ত হলেও ছোলা-মুড়ির জনপ্রিয়তা অটুট। এটি শুধু খাবার নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় যা ধর্মীয় চর্চা, ইতিহাস, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্বাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই চিরচেনা ইফতারের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিদেশি খাবার। ফলে ঐতিহ্যবাহী স্বাদের পাশাপাশি এখন দেখা মিলছে পিৎজা, বার্গার, পাস্তা, ফ্রাইড চিকেন, শাওয়ারমা ও নানা ধরনের ফাস্টফুড।
তবে ইফতারে ছোলা-মুড়ি খাওয়ার সূচনাকাল সম্পর্কে নির্দিষ্ট লিখিত প্রাচীন দলিল খুব সীমিত। অধিকাংশ তথ্যই খাদ্যসংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাস বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অনুমাননির্ভর। তবুও বলা যায়, এটি শতাব্দীব্যাপী সামাজিক চর্চার ফল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আরও পড়ুনরমজানে ‘হক আল লায়লা’ নামের এক বিশেষ আয়োজন হয় যে দেশেকেক-পেস্ট্রি একই জিনিস নাকি আলাদা?
কেএসকে