মতামত

মাহে রমজান: জীবনকে সাজাই কুরআনের আলোয়

দেখতে দেখতে রহমতের দশক প্রায় শেষের দিকে আর প্রবেশ করতে যাচ্ছি মাগফিরাতের দশকে। পরম দয়াময় আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন রহমতের এ দিনগুলোতে আমরা কতটুকু তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।

আল্লাহপাকের দরবারে হাজারো শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি, তিনি আমাদেরকে সুস্থতার সাথে পবিত্র মাহে রমজানের রোজাগুলো রাখার সৌভাগ্য দান করছেন, আলহামদুলিল্লাহ।

মাহে রমজানের সাথে পবিত্র কুরআনের এক বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। কেননা এ মাস পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস। এ মাসে মহান আল্লাহতায়ালা তার শ্রেষ্ঠ রসুলের প্রতি পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। যার ফলে রমজান মাসে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

মহানবি (সা.) শুধু কুরআন তেলাওয়াত করতেন না বরং এর মর্মকথা ও শিক্ষা নিজে আমল করতেন এবং তার প্রিয় সাহাবিদেরকে তা আমল করতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত রসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কল্যাণ মণ্ডিত পুরো জীবন এ বিষয়ের জীবন্ত সাক্ষী, তিনি শান্তি ও নিরাপত্তার এক মহান মূর্তিমান প্রতীক হিসাবে জীবন যাপন করেছেন এবং চরম প্রতিকূল ও কঠিন পরিস্থিতিতেও শান্তির পতাকা উঁচু রেখে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, কুরআনি শিক্ষামালার ওপর আমল করার মাধ্যমেই কেবল বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

মহানবির (সা.) মক্কার জীবন এবং মদিনার যুগেও তার পুরো জীবনাদর্শ এমন সব ঘটনাবলিতে পরিপূর্ণ যে, কীভাবে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার মান্যকারীদেরকে কুরআনের শিক্ষামালার কল্যাণে শান্তির মূর্তিমান প্রতীক বানিয়ে দিয়েছেন।

যুদ্ধ ক্ষেত্রেও তিনি মুসলমানদের সামনে এক পরম সহানুভূতিপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ উত্তম নৈতিক আদর্শ উপস্থাপন করেছেন। যুদ্ধের নাম নিলেই তো বর্তমান যুগের নাম সর্বস্ব সভ্য দেশগুলো নম্রতা, নৈতিক আচরণ, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বিচারের সকল দাবি সম্পূর্ণভাবে ভুলে যায় কিন্তু বিশ্বশান্তির মহানায়ক হজরত মুহাম্মদ (সা.) যুদ্ধ এবং হানাহানির ক্ষেত্রসমূহে শান্তি ও নিরাপত্তার উন্নত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে এমন অতুলনীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা সকল যুগে পুরো মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘রমজান ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, খোদা! আমি তাকে পানাহার এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নির্বৃত্ত রেখেছি, তাই তুমি তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল কর। আর কুরআন বলবে, আমি তাকে রাত্রে নিদ্রা হতে বিরত রেখেছি এবং তাকে ঘুমাতে দেইনি, এ কারণে তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল কর। তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে’ (বায়হাকি)।

মক্কা বিজয়ের দৃষ্টান্ত এ বিষয়ে স্পষ্ট সাক্ষী। তার সকল খুনি শত্রুদের ক্ষমা করে বিশ্ব ইতিহাসে সেই দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা কেয়ামত পর্যন্ত এর কোনো উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন চুক্তি পালনের ক্ষেত্রে মহানবি (সা.) সর্বদা এমন আদর্শ দেখিয়েছেন যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

আমরা জানি, মহানবির (সা.) যুগে সাহাবিরা অনেক বেশি কুরআন পাঠ করতেন। গভীর রাতে তাদের ঘর থেকে তেলাওয়াতের গুণগুণ রব উত্থিত হত। রাতের অন্ধকারে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের গৃহ পার্শ্বে গিয়ে তাদের সুমধুর তিলাওয়াত শ্রবণ করতেন।

কুরআন মজিদ মনোযোগ সহকারে এবং সুন্দরভাবে পাঠ করা সম্পর্কে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘সে আমাদের দলে নয়, যে সুর করে কুরআন পড়ে না’ (বুখারি)।

কুরআন পাঠের ফজিলত সম্পর্কে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কুরআন পাঠ কর, কেননা বিচার দিবসে এটি পাঠকের শাফায়াতকারী হবে’ (মুসলিম)।

কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার সাহাবিদের (রা.) প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রেরণ করতেন। হিজরতের পূর্বে তিনি হজরত মুসআব ইবনে উমাইয়ার (রা.) এবং হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাফতুম (রা.)কে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য মদিনায় প্রেরণ করেন। তিনি (সা.) কুরআনের শিক্ষা নিঃস্বার্থভাবে প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন।

এছাড়া রমজান এবং পবিত্র কুরআন করিমের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেভাবে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে— ‘রমজান সেই মাস যাতে নাযেল করা হয়েছে কুরআন যা মানবজাতির জন্য হেদায়াতস্বরূপ এবং হেদায়েত ও ফুরকান (অর্থাৎ হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী) বিষয়ক সুস্পষ্ট প্রমাণাদি। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ এই মাসকে পায়, সে যেন এতে রোজা রাখে, কিন্তু যে কেউ রুগ্ণ এবং সফরে থাকে তাহলে অন্য দিন গণনা পূর্ণ করতে হবে, আল্লাহ্ তোমারে জন্য স্বাচ্ছন্দ্য চান এবং তোমাদের জন্য কাঠিন্য চান না, এবং যেন তোমরা গণনা পূর্ণ কর এবং আল্লাহর মহিমা কীর্তন কর, এই জন্য যে, তিনি তোমাদেরকে হেদায়াতে দিয়েছেন এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’ (সুরা আল বাকারা : আয়াত ১৮৫)।

পবিত্র রমজান মাসেই হজরত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে প্রথম বাণী লাভ করেছিলেন আর এ রমজান মাসেই হজরত জিবরাইল (আ.) বছরের পূর্বে অবতীর্ণ হওয়া সমস্ত বাণী হজরত রসুল করিম (সা.)এর কাছে পুনরাবৃত্তি করতেন। এ ব্যবস্থা মহানবির (সা.) জীবনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

এছাড়া ‘মহানবির (সা.) জীবনের শেষ বছরের রমজান মাসে হজরত জিবরাইল (আ.) পূর্ণ কুরআনকে হজরত রসুল করিম (সা.)-এর কাছে দু’বার পাঠ করে শুনান’ (বুখারি)।

এ থেকে বোঝা যায়, রমজানের সাথে কুরআনের সম্পর্ক সুগভীর। এ পবিত্র মাসে রোজার কল্যাণ, আজ্ঞানুবর্তিতা এবং কুরআন পাঠ এই সব ইবাদত একত্রে মানব চিত্তে এক আশ্চর্য আধ্যাত্মিক অবস্থা সৃষ্টি করে।

এ প্রসঙ্গে হজরত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘রমজান ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, খোদা! আমি তাকে পানাহার এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নির্বৃত্ত রেখেছি, তাই তুমি তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল কর। আর কুরআন বলবে, আমি তাকে রাত্রে নিদ্রা হতে বিরত রেখেছি এবং তাকে ঘুমাতে দেইনি, এ কারণে তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল কর। তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে’ (বায়হাকি)।

আমরা যেহেতু রমজানের রোজাগুলো ঠিকভাবেই রাখছি, তেমনিভাবে যদি কুরআন পাঠের প্রতি এবং এর মর্মার্থ উপলব্ধি করার দিকে মনোযোগী হই, তাহলে এ কুরআনই আমাদের সুপারিশের কারণ হবে।

এছাড়া রোজা রেখে কুরআন করিম পাঠ করা, এর অর্থ বুঝতে চেষ্টা করা এবং এর অনুশাসন পালন করার মাধ্যমে মানুষের আধ্যাত্মিক দর্শন শক্তি সতেজ হয়। মানুষ শয়তানি চিন্তাভাবনা ও প্রভাব হতে নিরাপদ থাকে। অধিকন্তু মানুষ এক অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এবং পরম সম্পদ লাভ করে, যা শুধু অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায়, এটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

আমাদের উচিত হবে, রমজানের এই দিনগুলোতে নিজেদের ইবাদতে আমূল পরিবর্তন আনা আর বেশি বেশি পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত ও এর অর্থ বুঝে নিজ জীবনে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা।

আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে পবিত্র কুরআনের শিক্ষার আলোকে জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।masumon83@yahoo.com

এইচআর/জেআইএম