উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকরা। মাঠ থেকে পাইকারি বাজার—সর্বত্রই আলুর দামে ধস নেমেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু মাত্র ৩ থেকে ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি ১২ থেকে ১৫ টাকা। ফলে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামও না পেয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক।
কৃষকদের ভাষ্যমতে, এ বছর প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকা। বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকের জন্য গুনতে হয়েছে বাড়তি অর্থ। কিন্তু বাজারে আলুর দাম মিলছে মাত্র ৩ থেকে ৭ টাকা। ফলে উৎপাদন খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এমনকি আলু তোলার শ্রমিক খরচও উঠছে না। এর ওপর হিমাগারের ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় আলু সংরক্ষণ করা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম দুশ্চিন্তা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও আবাদ হয়েছে ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ টন। গত মৌসুমে ৩৪ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ১২৫ টন উৎপাদিত হয়েছিল। জেলায় ১৭টি হিমাগারে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৩২ টন আলু সংরক্ষণ করা যায়, যা মোট উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম।
সদর উপজেলার আকচা এলাকার কৃষক লতিফুর রহমান বলেন, গত মৌসুমেও আলু চাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ঋণ করে এবারও দুই বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। কিন্তু এবারও উৎপাদন খরচ তুলতে পারব না।
সদর উপজেলার নারগুন এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, প্রতি বিঘায় আলু চাষে খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অথচ বাজারে দাম ৫-৭ টাকা। একজন শ্রমিকের মজুরি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, এক বিঘার আলু তুলতে ৮-১০ জন শ্রমিক লাগে। এই দামে বিক্রি করে শ্রমিক ও পরিবহন খরচই উঠছে না।
একই উপজেলার ইদ্রিস আলী জানান, ১২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেও দাম না থাকায় এবং হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে তিনি ফসল সংরক্ষণ করতে পারছেন না।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হাসু মন্ডল দীর্ঘ ২০-২২ বছর ধরে আলু চাষ করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এত কম দামে কখনও আলু বিক্রি করিনি। আগামী বছর আর আলু চাষ করব না, অন্য ফসলে চলে যাব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁওয়ের উপ-পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, গত মৌসুমে লোকসানের পর কৃষকদের কম জমিতে আলু চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক কৃষক বেশি লাভের আশায় আবারও বেশি জমিতে আবাদ করেছেন।
মাজেদুল আরও বলেন, আগে ঠাকুরগাঁওয়ের আলু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতো। এখন অন্যান্য জেলাতেও আলু চাষ বাড়ায় চাহিদা কমেছে। আমরা কৃষকদের বিকল্প ফসল চাষ এবং পরিকল্পিত উৎপাদনের বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতে তারা লোকসানের ঝুঁকি কমাতে পারেন।
তানভীর হাসান তানু/কেএইচকে/এএসএম