পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাকা সড়কের পাশে উঁচু উঁচু ভবন। হঠাৎ সড়কঘেঁষা অনেকটা ফাঁকা জায়গায় চোখ পড়লো। ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা এখানে খেলাধুলায় মেতেছে, গরু ঘাস খাচ্ছে। জায়গাটির শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটু গর্ত, সঙ্গে আছে যৎসামান্য পানি। সেখানে ইচ্ছামতো বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট ফেলা হচ্ছে। মনে হচ্ছে- ছোট্ট গর্তটাও ভরাট করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে স্থানীয় লোকজন।
এই জায়গাটির অবস্থান ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্র আমলাপাড়া এলাকায়। ২৫ শতাংশের পুরো জায়গাটি একসময় পুকুর ছিল। পুকুরটি আমলাপাড়া পুকুর ও শেরপুকুর নামে পরিচিত। শেরপুকুরে সারাবছর স্বচ্ছ পানি থাকত, সঙ্গে থাকত মাছ। অনেকেই গোসল করত, সাঁতার কাটত। গৃস্থালির কাজেও এই পুকুরের পানি ব্যবহার করা হত।
শিশু-কিশোরদের জলকেলির পাশাপাশি কখনো নগরীতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহার হত এই পুকুরের পানি। কিন্তু আজ তা শুধুই স্মৃতি। দীর্ঘ এক যুগে সেসবই উধাও হয়ে গেছে। মৃত্যু ঘটেছে পুকুরটির।
সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা এই পুকুরটি লিজ নিয়ে ধীরে ধীরে ভরাট করা হয়৷ পুকুরের জায়গায় সুউচ্চ ভবন নির্মাণের আগ মুহূর্তে প্রশাসনের নজরে আসে। সরকারি জায়গাটি উদ্ধারও করেছে প্রশাসন। কিন্তু পুকুর আর নেই। নতুন প্রজন্ম জানেও না এই জায়গাটিতে একসময় ছিল বিশাল পুকুর।
অথচ শত বছরের পুরোনো ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত শেরপুকুরটি ছিল অর্পিত সম্পত্তি। ১৯৮৪ সালে পুকুরটি মাছ চাষের জন্য ব্যক্তি খাতে লিজ দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। কিন্তু সেখানে আর মাছ চাষ হয়নি; বরং দিনের পর দিন পুকুরটি ময়লা-আবর্জনা ও মাটি ফেলে ভরাট করা হয়। সর্বশেষ জমিটি ইজারা নিয়েছিলেন ময়মনসিংহ শহরের ব্যবসায়ী মো. রেজাউল করিম নামে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। ২০১২ সালে এই লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু লিজ নবায়ন না করে এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পুকুরটি ভরাট করে উঁচু ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা করে আসছিলেন। গতবছরের ৩ জুলাই দুপুরে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আসাদুজ্জামান রনির নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে পুকুর ভরাট করে তৈরি করা উঁচু ভিটেটি দখলমুক্ত করা হয়।
শুধু শেরপুকুর না। অনেক পুকুরই ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেছে। অনেক পুকুরের অস্তিত্বই নেই। কারণ পুকুর থাকা জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে। নগরীতে পুকুর সংকট দেখা দেওয়ায় এর মাশুল যেমন নগরবাসী গুনছে, ঠিক তেমনি ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে এসে অনেক সময় পানির সংকটে পড়ছে। পুকুর না পেয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও। ফলে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়।
শহরেই অবস্থিত দেড়শ বছরের প্রাচীন পদ্ম পুকুর, যা দীর্ঘদিন ধরে পচা পুকুর নামে পরিচিত। এই পুকুরটি এক সময় শহরবাসীর পানীয় জলের চাহিদা মেটাত। টলমলে স্বচ্ছ পানিতে ছিল হয়ত পদ্ম ফুলও। তাই নাম হয়ে উঠেছিল পদ্ম পুকুর। এক সময় অনাদরে ও অবহেলায় কচুরিপানার দাপটে পুকুরটি ঢাকা পড়ে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। ফলে পদ্ম পুকুরের নাম হারিয়ে হয়ে যায় পচা পুকুর। বর্তমানে কচুরিপানা না থাকলেও পুকুরপাড়সহ পানিতেই ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, শহরে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভেতরে, পুলিশ লাইন্স, আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠের সঙ্গে, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকাসহ বেশ কিছু এলাকায় থাকা সরকারি পুকুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর রয়েছে। তবে এই শহরজুড়ে একসময় শতাধিক পুকুর ছিল। ধীরে ধীরে তা ভরাট হয়েছে, হচ্ছে। অনেকে এসব পুকুরে নিয়মিত গোসল করতেন, সাঁতার কাটতেন। আবার অনেকে মাছ ধরতেন। কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারতো ফায়ার সার্ভিস। তবে সে পরিস্থিতি এখন নেই বললেই চলে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুকুর ভরাট হয়েছে। বর্তমানে হাতেগোনা কিছু পুকুর রয়েছে।
আমলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, এই এলাকায় থাকা বিশাল শেরপুকুরটি বর্তমানে ভরাট অবস্থায় রয়েছে। অথচ পুকুরটির পানি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হত। পুকুরের পানিতে জীববৈচিত্র্যও ছিল। মাছ, ব্যাঙ, নানা ধরনের পোকামাকড় এবং জলজ উদ্ভিদ পরিবেশের অংশ ছিল। তবে এই জায়গা দেখলে বোঝার উপায় নেই- এখানেই একসময় পুকুর ছিল। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আবারো শেরপুকুরের ভরাট হওয়া জায়গায়টি খনন করা হোক।
আকুয়া এলাকার বাসিন্দা শহীদুর রহমান বলেন, শহরে পুকুর ভরাটের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আধুনিক নির্মাণ প্রকল্প, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে জমির ব্যবহার। শহরে বাসস্থানের চাপ অনেক বেড়ে গেছে, যা শহরের জনসংখ্যাকে আরও ঠাসাঠাসি করে ফেলেছে। এছাড়া সরকারি জায়গায় থাকা পুকুরেও চোখ পড়ছে এক শ্রেণির প্রভাবশালীদের। শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়া জরুরি। শহরের পরিবেশের উন্নতির জন্য পুকুর ভরাটের বদলে সেগুলোর সংস্কার এবং সংরক্ষণ করা উচিত।
জনউদ্যোগ ময়মনসিংহের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম (চুন্নু) বলেন, শহরে সময়ের ব্যবধানে পুকুরের সংখ্যা কমছে। সরকারি জায়গায় থাকা পুকুর ভরাটের নজিরও রয়েছে। দখল হওয়া শেরপুকুরটি এররই মধ্যে জেলা প্রশাসন দখলমুক্ত করেছে। তবে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পুকুরটি সরকারি উদ্যোগে আগের চেয়ে গভীরভাবে খনন করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করার দাবি জানাচ্ছি। যা ঐতিহ্যের একটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বয়ে চলবে যুগ যুগ ধরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। পুকুর রক্ষায় মানুষকে সচেতন হতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহের উপপরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, অগ্নিনির্বাপণের সময় ফায়ার সার্ভিসের পর্যাপ্ত পানির উৎসের অভাবে সমস্যা হয়। বিশেষ করে শহর এলাকায় পুকুর বা জলাশয়ের অভাব প্রকট, ফলে প্রায়ই দূরবর্তী উৎস থেকে পানি আনতে বা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়, যা আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব ঘটায়। আগুন নেভাতে গিয়ে গাড়ির পানি শেষ হয়ে গেলে আর পানি পাওয়া যায় না। তখন দূর থেকে পানি আনতে সময় বেশি লাগে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সচিব সুমনা আল মাজীদ বলেন, পদ্ম পুকুরের পানি আগের চাইতে ভালো। তবে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। কারণ পুকুরে কিংবা পাড়ে ময়লা-আবর্জনা ফেললে পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়াবে। পুকুর রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান জাগো নিউজকে বলেন, কোন এলাকায় কী পরিমাণ জায়গা ভরাট হয়েছে সে সম্পর্কে তথ্য নেই। তবে বেদখল থাকা শেরপুকুরটি এরই মধ্যে উদ্ধার হয়েছে। পুকুরটি বর্তমানে ভরাট অবস্থায় রয়েছে। সেখানে পুনরায় পুকুর খনন করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এছাড়া সরকারি জায়গায় থাকা কোনো পুকুর দখল কিংবা ভরাটের চেষ্টা করা হলে দখলকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এফএ/এএসএম