মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান (রহ.)
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং মিথ্যার ওপর নির্ভর কাজ বর্জন করেনি, তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। (সহিহ বুখারি: ১৯০৩)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, ইবাদত তখনই ইবাদত হিসাবে গণ্য হয়, যখন তা মানুষের স্বভাব ও চরিত্রে পরিবর্তন আনে। কেউ যদি ইবাদত করে অথচ একই সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে এবং মিথ্যার ওপর জীবন পরিচালনা করে, তবে তার ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। আল্লাহ এমন আমল চান যা মিথ্যামুক্ত; সেই আমল নয় যার সঙ্গে মিথ্যা মিশে আছে।
এই হাদিসে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, একটি মিথ্যা কথা, অন্যটি মিথ্যার ওপর নির্ভর কাজ:
১. মিথ্যা কথার মানে হলো, কথাবার্তায় সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ না থাকা; বাস্তবতার সাথে মিল নেই এমন কথা বলা। তবে শুধু সে-ই মিথ্যাবাদী নয়, যে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বানিয়ে বানিয়ে বলে। হাদিসে সেই ব্যক্তির কথাকেও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যে যাচাই না করে যা শুনে তা-ই প্রচার করে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, একজন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়। (সহিহ মুসলিম, ৫)
অর্থাৎ একজন একটি কথা শুনল, সে এই বিষয়টি সত্য না মিথ্যা তা যাচাই করে দেখল না, কিন্তু দশজন মানুষের কাছে বলে বেড়াতে লাগল, সে যদি এই কাজ সরল মনেও করে থাকে, তবু মিথ্যাবাদী হিসাবে গণ্য হবে।
২. মিথ্যার ওপর নির্ভর কাজ বলতে বোঝায়—মানুষ যখন মিথ্যাকেই তার কর্মের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে । যেমন মিথ্যা ও চটকদার স্লোগান দিয়ে নেতৃত্ব অর্জন করা, ভিত্তিহীন গল্প বানিয়ে কাউকে অপমান করা, জাল দলিল তৈরি করে অন্যের সম্পদ দখল করা, অলীক ও বানানো বক্তব্য দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করা—অর্থাৎ সত্যের বদলে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে জীবন গড়ার চেষ্টা করা।
রোজা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এর প্রতিদান সাধারণ আমলের তুলনায় অনেক বেশি। এর কারণ, রোজার মধ্যে ত্যাগ ও কোরবানির উপাদান রয়েছে। রোজা হলো আমলকে ত্যাগ ও আত্মসংযমের স্তরে উন্নীত করা।
রমজানে এক মাস রোজা পালন ইসলামের বিশেষ ইবাদত। হাদিসে এর বিশেষ প্রতিদানের কথা বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, মানব সন্তানের প্রতিটি নেক কাজের সওয়াব দশ গুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিফল দান করব। বান্দা আমারই জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।’ রোজা পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে। একটি তার ইফতারের সময় এবং অপরটি তার প্রতিপালক আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। (সহিহ মুসলিম, ১১৫১)
রোজার এই অসাধারণ মর্যাদার কারণ হলো, রোজার কষ্ট মানুষের অন্তর্জগতে বিশেষ এক মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করে। তখন তার দোয়া সাধারণ অবস্থার মতো থাকে না; হৃদয়ের গভীরতা থেকে ব্যাকুল প্রার্থনা বেরিয়ে আসে।
ক্ষুধা ও তৃষ্ণা যখন মানুষকে কষ্ট দেয়, তখন সে নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে। সে আরও গভীরভাবে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং বলে, হে আল্লাহ, আপনার একটি নির্দেশ পালন করেছি, কিন্তু আপনার বহু নির্দেশ পালন করতে পারিনি। একদিন রোজা রেখেছি, অথচ জীবনের বহু ক্ষেত্রে সংযম রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। আপনার বিশেষ রহমতে আমাকে ক্ষমা করুন।
বান্দার অন্তর থেকে যখন এ ধরনের দোয়া উচ্চারিত হয়, তখন আল্লাহর রহমত তার দিকে ধাবিত হয়। তখন প্রতিদান শুধু দশ গুণ বা সাত শত গুণে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সীমাহীন অনুগ্রহে রূপ নেয়।
সাধারণত ইবাদত দুনিয়ায় করা হয় আর তার প্রতিদান আখেরাতে দেওয়া হয়। কিন্তু রোজা ব্যতিক্রমধর্মী ইবাদত। এর প্রতিদানের স্বাদ মানুষ দুনিয়াতেই অনুভব করতে শুরু করে। ইফতার যেন সেই প্রতিদানের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা, আর আখেরাতে আল্লাহর অসীম পুরস্কার তার চূড়ান্ত পরিণতি।
তর্জমা: মওলবি আশরাফ
ওএফএফ