পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে এমন এক মসজিদ, যার দেখভাল করে এক হিন্দু পরিবার। নাম তার ‘আমানতি মসজিদ’। এই মসজিদের নাম শোনেনি—এমন লোক বারাসাত শহরে খুঁজেও পাওয়া ভার। যদিও অনেকের কাছেই এটি ‘বসু বাড়ির মসজিদ’ নামে পরিচিত।
রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত শহরের প্রাণকেন্দ্রে নবপল্লী বয়েজ স্কুলের কাছে প্রতাপাদিত্য রোডে অবস্থিত এই মসজিদ। হিন্দু অধ্যুষিত ওই এলাকায় কোনো মুসলিম পরিবার নেই। তবে দূর-দূরান্ত থেকে মুসলিমরা ঠিকই নামাজ পড়তে আসেন আমানতি মসজিদে। রমজান মাসে বা ঈদের দিন মুসল্লির সংখ্যা বিশাল আকার ধারণ করে।
প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি প্রায় ছয় দশক ধরে দেখাশোনা করছেন বসু পরিবারের সদস্যরা। তাদের জমিতেই রয়েছে এই মসজিদ। একসময় মসজিদটির দেখাশোনা করতেন দীপক বসু। কিন্তু বয়সের ভারে আর সেই সময় দিতে পারেন না তিনি। ফলে বর্তমানে বসু পরিবারের পক্ষ থেকে মসজিদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর ছেলে পার্থ সারথি বসু। নিষ্ঠার সঙ্গে মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন এই যুবক।
তবে শুধু মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণই নয়, মুসলিমদের মতো রমজান মাসে ‘রোজাও’ রাখেন পার্থ সারথি বসু। কয়েক বছর ধরেই তিনি এ কাজ করে আসছেন। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি।
আরও পড়ুন>>রমজানে ইসরায়েলি খেজুর বয়কটের ডাক কলকাতায়পশ্চিমবঙ্গে রমজানে বেড়েছে ফলের চাহিদা, দাম চড়া‘বাংলাদেশি বয়কট’ থেকে সরে আসলেন শিলিগুড়ির হোটেল মালিকরা
পার্থ সারথি বলেন, “রমজান মাসে এ নিয়ে আমার টানা ১৪ বছর ‘রোজা’ রাখা হলো। তার আগেও রাখতাম, অল্প-অল্প করে। কিন্তু গত ১৪ বছর ধরে সবগুলো ‘রোজা’ রাখছি।”
এর কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই হিন্দু যুবক জানান, “একবার রোজার সময় বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে আড্ডা দিতে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার হাত ভেঙে যায়। এরপর অনেক চিকিৎসক দেখাই। তাঁরা বলেন, অস্ত্রোপচার করতে হবে। তখন একদিন মসজিদে এসে বলি, ‘সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমার হাত ঠিক করে দাও। রমজান মাসে আমি অন্যায় করে ফেলেছি। আমি আর এই ভুল করব না। এরপর থেকে রমজানে আমি রোজা রাখব।’ আশ্চর্যজনকভাবে তারপর থেকেই আমার হাতটা ঠিক হয়ে যায়। তখন থেকেই আমার রোজা রাখা শুরু। আজও রেখে চলেছি, আমৃত্যু রেখে যাবো।”
রমজান মাসে ইফতারের আয়োজন নিয়ে পার্থ সারথি বলেন, “আমাদের এই অঞ্চলের কিছু মুসলিম ভাই মসজিদ পরিচালনা করেন। একেকজন একেকদিন ইফতারের ব্যবস্থা করেন। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২৫ জন এই মসজিদে ইফতার করি।”
১৯৬৪ সালের কথা। সে সময় বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বারাসাতের ওই জমি পান পার্থ সারথির দাদা (ঠাকুরদাদা) নিরোদ কৃষ্ণ বসু। এরপর বংশপরম্পরায় তাঁর ছেলে দীপক বসু এবং বর্তমানে পার্থ সারথি মসজিদের দেখাশোনা করছেন।
এ ব্যাপারে পার্থ সারথি জানান, ‘‘আমরা বাংলাদেশের খুলনা জেলার বাসিন্দা ছিলাম। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিই। এ সময় নবপল্লীর প্রতাপাদিত্য রোডের তৎকালীন বাসিন্দা ওয়াজুদ্দিন মোড়লের সঙ্গে জমি বিনিময় হয়। দুই ভাই নিরোদ কৃষ্ণ বসু ও বিনোদ বিহারী বসু এই জমি পান। বিনিময় প্রথা অনুযায়ী ওয়াজুদ্দিন তাঁর এই জমি বসু পরিবারকে দিয়ে বাংলাদেশের খুলনায় বসু পরিবারের জমি নেন। সে সময় বারাসাতের ওই জমিতে জরাজীর্ণ একটি ঘর পায় বসু পরিবার। কিন্তু ঘরের আকৃতি দেখে পার্থ সারথির দাদার মনে হয় এটি মসজিদ। এরপর ট্রাঙ্ককল করে বাংলাদেশে ওয়াজুদ্দিন পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সে সময় বসু পরিবারকে জানানো হয়, মসজিদ ভেঙে ফেলা বা রেখে দেওয়া তাঁদের ইচ্ছা। কিন্তু আমার ঠাকুরদাদা নিরোদ কৃষ্ণ বসু ঠিক করেন, তিনি মসজিদটি রাখবেন। সেই থেকে আমার ঠাকুমা লীলাবতী বসু প্রতিদিন মসজিদে আলো জ্বালাতেন।’’
হিন্দু এলাকায় মসজিদ থাকা কিংবা হিন্দু পরিবারের সন্তান হয়ে ‘রোজা’ রাখা নিয়ে সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে পার্থ সারথি বলেন, “বসু পরিবারের সঙ্গে আমানতি মসজিদের যেমন আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গেও মসজিদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক রয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, হিন্দু মায়ের কোলে এক সন্তান রয়েছে—সে-ই আমানতি মসজিদ। এই অঞ্চলের হিন্দু মানুষও এই মসজিদকে শ্রদ্ধা করেন।”
মসজিদের ইমাম মাওলানা আখতার আলী বলেন, “আমি এখানে ১৯৯৫ সাল থেকে আছি। এখনো ইমামতি করছি। হিন্দু এলাকায় মসজিদ—এটি একটি নজির। বিশ্বে এমন নজির আছে কি না, আমার জানা নেই। একটি হিন্দু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত। আমরা মুসলিমরা নামাজ পড়ে চলে যাই, কিন্তু মসজিদটির দেখাশোনার পুরো দায়িত্বে রয়েছে বসু পরিবার।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সংবিধানে এমন কিছু নেই যে, হিন্দু হলে তারা মসজিদের দেখভাল করতে পারবে না। ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। সবাইকে নিয়ে যে ধর্ম পালন করতে হয়, সেটিই ইসলাম।”
ডিডি/কেএএ/