অর্থনীতি

অনলাইনে জমতে শুরু করেছে ঈদের কেনাকাটা, প্রত্যাশা ভালো বিক্রির

> বিক্রিতে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা> অনলাইনে প্রায় ৫ লাখ পেজে বেচাকেনা হয়> ই-ক্যাবের সদস্য প্রায় ৩ হাজার

ঈদ সামনে রেখে দেশে অনলাইন কেনাকাটা জমে উঠতে শুরু করেছে। নতুন সরকারের আমলের প্রথম ঈদে উদ্যোক্তারা ভালো বেচাবিক্রির প্রত্যাশা করছেন। এখনও কেনাকাটা সেই অর্থে শুরু না হলেও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রচুর অর্ডার আসবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

দেশে কয়েক বছর ধরেই অনলাইন কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয়। ঘরে বসেই এখন সবকিছু কেনাকাটা করা যায়। থ্রি-পিস থেকে শুরু করে লিপস্টিক, পাঞ্জাবি-শাড়ি, নারীর গহনা, কসমেটিক্স, হস্তশিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে সারা বছরই কেনাকাটা চলে। তবে ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা আরও বেশি জমজমাট হয়ে ওঠে। অনলাইন কেনাকাটায় মধ্য রমজানে এখন সেই ঈদের আবহ শুরু হতে যাচ্ছে।

জানা গেছে, দেশে উদ্যোক্তাকেন্দ্রিক ফেসবুক পেজের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও কেউ কেউ এই সংখ্যা ১০ লাখ বলেও মনে করছেন। ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের সদস্য প্রায় ৩ হাজার। দেশে সক্রিয় এফ কমার্স (ফেসবুক) উদ্যোক্তা প্রায় ২ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার। নিয়মিত বিক্রি ও সেবা প্রদানকারী পেজের সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি। ফেসবুকভিক্তিক উদ্যোক্তা ও ই-কমার্স উদ্যোক্তারা এবারের ঈদ সামনে রেখে বেচাবিক্রিতে নতুন স্বপ্ন বুনছেন।

জমতে শুরু করেছে ঈদের কেনাকাটা, ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

পাকিস্তানি থ্রি-পিস বিক্রি করে এমন একটি পেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত ঈদে প্রায় এক কোটি টাকার মতো লাভ করেছেন। এবার দেড় কোটি টাকা লাভ করার লক্ষ্য রয়েছে। পেজটিতে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার থ্রি-পিস বিক্রি হয়।’

ফার্মগেট এলাকা থেকে পরিচালিত একটি কসমেটিক্স পেজের গোডাউনে দেখা গেছে, প্রতিদিনই পেজটি থেকে ভালো পার্সেল যাচ্ছে। বেচাবিক্রি ভালো হচ্ছে।

অনলাইন পেজে কাপড় বিক্রি করেন এমনটি একটি পেজের উদ্যোক্তা ইকবাল জাগো নিউজকে বলেন, এবার বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। কাপড় বিক্রিতে ঈদের আগেই উৎসব শুরু হয়ে গেছে। আশা করছি গতবারের চেয়ে ভালো বিক্রি হবে।

ঈদের কেনাকাটা জমতে শুরু করেছে, ছবি: জাগো নিউজ

একটি কসমেটিক্স পেজের উদ্যোক্তা আতিফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন বৈশ্বিক সমস্যা চলছে। যুদ্ধের কারণে ফেসবুকের ইমপ্রেশন সমস্যা হচ্ছে। এতদিন খারাপ অবস্থা গেছে। কয়েকদিন আগের চেয়ে এখন একটু ভালো। নির্বাচনের আগে যেমন খারাপ ছিল, এখন তার চেয়ে একটু বেটার হয়েছে। আশা করছি আগামী দু-একদিনের মধ্যে ঈদের মূল বেচাকেনা শুরু হবে।’

সেভেন স্টার বিউটি নামের একটি কসমেটিক্স পেজের উদ্যোক্তা এস এম জিহাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনলাইনে কেনাকাটা ভালো চলছে। এবার মানুষজন কেনাকাটা করবে মনে হয়। মাসের প্রথম দিকে বেতন পাওয়ার পর মানুষ কেনাকাটা শুরু করবে বলে মনে হচ্ছে। অনেকেই কেনাকাটা শুরু করেছেন, তবে অনলাইন বেচাবিক্রিতে এখনও ঈদের ফিল পাওয়া যাচ্ছে না।’

হস্ত ও কারুশিল্প এবং তাঁত ও বুটিকস পণ্যের প্রতিষ্ঠান ‘সুতার কাব্য’। প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে তাদের পণ্য বিক্রি করে। ‘সুতার কাব্যের’ উদ্যোক্তা মোসাম্মৎ সিরাজুম মনিরা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি আসলে ডিপেন্ড করে কেমন বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। মানে বুস্ট করার ওপর কেনাকাটা নির্ভর করে। যেমন বুস্ট করা হয় তেমন বিক্রি হয়। বেচাকেনা এবার কম। অন্যবারের চেয়ে কম। ঈদের সময় প্রচুর রাশ থাকতো। পাইকারিতে ভালো বিক্রি হচ্ছে। সিঙ্গেল বিক্রি গতবারের চেয়ে অর্ধেক এবার।’

ঈদের কেনাকাটা জমতে শুরু করেছে, ছবি: জাগো নিউজ

ফেসবুক পেজ ও শোরুমের মাধ্যমে জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি ও বাটিক থ্রি-পিস বিক্রি করে ‘তনয় ক্রিয়েশন’। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা কানিজ ফাতেমা তানিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদে তো অনেক সময় মানুষ দুইটা বেতন পেতো। এবার মনে হয় একটি বেতনই পাবে। এখনও সবাই বেতন পাননি। এ কারণে ১০ রোজা পর্যন্ত বেচাকেনা তেমন হয়নি। যেখানে প্রতিদিন লাখ টাকার ওপরে বিক্রি হয়, সেখানে বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। টেনেটুনে ৫০ হাজার টাকা সেল। মনে হচ্ছে বেতন পাওয়ার পরে মানুষ কেনাকাটা শুরু করবে।’

ই-ক্যাবের সহায়ক কমিটির সদস্য ও এজিউর কুইজিনের প্রধান নির্বাহী জান্নাতুল হক শাপলা জাগো নিউজকে বলেন, ​এবার অনলাইনে কেনাবেচার ধারা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক। এখন আর ই-কমার্স শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক নেই, এটি প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মানুষ এখন শুধু শখের বশে নয়, বরং প্রয়োজনে এবং আস্থার সঙ্গে অনলাইনে কেনাকাটা করছে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে অর্ডারের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এবারও তাই হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারী উদ্যোক্তারা এখন ফেসবুক কমার্স এবং ই-কমার্সের মাধ্যমে নিজেদের পণ্য সারা দেশে পৌঁছে দিচ্ছেন। আগে অনলাইনে শুধু পোশাক বা কসমেটিকস বেশি চলতো, কিন্তু এখন গৃহস্থালি পণ্য থেকে শুরু করে অর্গানিক ফুড এবং ইলেকট্রনিক্স—সবই দেদারসে বিকোচ্ছে। ই-ক্যাবে আমাদের লক্ষ্যই হলো এই প্ল্যাটফর্মটি আরও নিরাপদ ও গতিশীল করা, যাতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত না হয় এবং উদ্যোক্তারা সঠিক মূল্য পায়।

জান্নাতুল হক শাপলা আরও বলেন, অনলাইন কেনাবেচা এখন আর কেবল একটি বিকল্প মাধ্যম নয়, এটিই এখন অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে গেছে। আমি ক্রেতাদের অনুরোধ করবো—নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যের ওপর আস্থা রাখুন, দেশি পণ্য কিনুন।

ইএইচটি/এসএনআর