নওগাঁর মহাদেবপুরে আব্দুল হামিদ ওরফে ধলা (৬৪) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। আসামি না হলেও হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের টানাহেঁচড়া ও লাথি মারার পর ওই বৃদ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে পুলিশ।
বুধবার (৪ মার্চ) দিনগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার হাতুড় ইউনিয়নের মালাহার উত্তরপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিবেশীর করা মামলায় আব্দুল হামিদের ছেলে ইমরানের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ছিল। ইমরান ঢাকায় রিকশা চালান। কয়েক দিন আগে বাড়ি এসেছেন। আসামি ধরতে বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মহাদেবপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুজ্জামান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আছির উদ্দিনসহ পাঁচজন পুলিশ সদস্য অভিযান চালান।
এসময় পুলিশ আব্দুল হামিদের বাড়িতে গিয়ে জানালা দিয়ে ডেকে অন্য আসামি এসলামের বাড়ি দেখিয়ে দিতে বলেন। একপর্যায়ে পুলিশ লাথি দিয়ে টিনের দরজা ভেঙে আব্দুল হামিদের বাড়িতে প্রবেশ করে। এসময় তার ছেলে ইমরান ভয়ে পালিয়ে যান। পুলিশ তার বাবা আব্দুল হামিদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে আটক করে টেনেহেঁচড়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে। এসময় ইমরানের ১১ বছরের ছেলে রিপনও দাদার সঙ্গে বাইরে আসে।
আব্দুল হামিদ তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। এতে পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে লাথি মারেন। এতে অসুস্থ হয়ে পড়েন বৃদ্ধ আব্দুল হামিদ। এরপরই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। স্থানীয়রা এসে আব্দুল হামিদকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
এ ঘটনার সমাধান না হওয়ায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মরদেহ বাড়িতেই রাখা হয়। ঘটনার পর থেকেই একটি চক্র বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠে। দফায় দফায় চলে বৈঠক। এরপরই নিহতের স্বজনরা থানায় গিয়ে পুলিশের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। নিহতের বড় ছেলে জাহিদুল ইসলাম তার বাবার মৃত্যুতে তাদের কোনো অভিযোগ নেই এবং মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতি চেয়ে থানায় একটি লিখিত আবেদনে সই করেন।
নিহত আব্দুল হামিদের নাতি রিপন বলেন, ‘আমরা দাদা-নাতি এক ঘরে ঘুমিয়ে ছিলাম। মধ্যরাতে দরজা ভেঙে পাঁচজন পুলিশ বাড়িতে প্রবেশ করে দাদার হাতকড়া লাগিয়ে জোরপূর্বক বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। আমিও দাদার সঙ্গে বাইরে যাই। দাদা আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশকে অনুরোধ করেন এবং পা জড়িয়ে ধরেন। এসময় পুলিশ লাথি মারলে দাদা মাটিতে পড়ে যান। এরপর বুকে ব্যথা শুরু হলে কিছু সময়ের মধ্যে দাদা মারা যান।’
ওই গ্রামের মৃত ধলা বক্সের ছেলে এসলাম বক্স বলেন, ‘রাতে কয়েকজন পুলিশ আব্দুল হামিদের বাড়িতে ঢুকে ওয়ারেন্ট আছে জানিয়ে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।’
এ বিষয়ে মহাদেবপুর থানার ভারপাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে আটক করতে ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে একজন আসামিকে আটক করা হয়। পরে আরেকটি বাড়িতে অভিযান দিলে সেই বাড়ি থেকে কোনো আসামি পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে পুলিশ আব্দুল হামিদের বাড়িতে গিয়ে তার কাছে সহযোগিতা চাইলে তিনি নিজ থেকে সহযোগিতা করেন। এসময় তার নাতিও সঙ্গে ছিল। এরপর তাকে রেখে পুলিশ চলে আসে।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশ আসার ২-৩ ঘণ্টা পর জানানো হয় তিনি মারা গেছেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি স্ট্রোক করে মারা গেছেন। সেখানে পুলিশের মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জয়ব্রত পালকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আরমান হোসেন রুমন/এসআর/জেআইএম