লাইফস্টাইল

কর্মক্ষেত্রে নারীর পোশাক নয়, পারফরম্যান্স হোক পরিচয়

আজকের দিনটি নারীদের জন্য একটু বিশেষ। কারণ আজ (৮ মার্চ) বিশ্ব নারী দিবস। বিশেষ এই দিনে নানা ধরনের আয়োজনের পাশাপাশি শুভেচ্ছা বার্তায় মুখর হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। লোক দেখানো অনেক কিছুই হয় এই দিনে। তবে আমরা অনেকেই জানি না এই দিনটি শুধুই ফুল, শুভেচ্ছা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রঙিন পোস্ট দেওয়ার দিন নয়; বরং নারীর অধিকার, সম্মান ও সমতার প্রশ্নকে সামনে আনার দিন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয় ‘সমতা’ ও ‘ক্ষমতায়ন’-এর বার্তা নিয়ে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন শুরু করে, যা আজ বৈশ্বিক সচেতনতার প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন হলো কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রকৃত পরিচয় কি তার যোগ্যতা, দক্ষতা ও পারফরম্যান্স, নাকি এখনো অনেক ক্ষেত্রে তার পোশাক, চেহারা ও ব্যক্তিগত স্টাইল?

পোশাক নিয়ে বিচার

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন, নীতিনির্ধারণী পদে আছেন, উদ্যোক্তা হচ্ছেন, প্রযুক্তি খাতে কাজ করছেন। তবু অফিসে ঢুকেই অনেক নারীকে শুনতে হয় ‘আজ খুব সাজগোজ করেছেন!’, ‘এভাবে অফিসে আসা ঠিক হলো?’, ‘প্রেজেন্টেশনের চেয়ে আপনার ড্রেসই বেশি নজর কাড়ল!’-এই মন্তব্যগুলো আপাতদৃষ্টিতে হালকা মনে হলেও, এগুলো কর্মক্ষেত্রে নারীর পেশাগত পরিচয়কে আড়াল করে দেয়। তার কাজ, দক্ষতা ও প্রস্তুতির চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তার পোশাক।

লুকিং শেমিং

কর্মক্ষেত্রে পোশাক নিয়ে কটাক্ষ বা সূক্ষ্ম মন্তব্যকে অনেক সময় স্বাভাবিক বিষয় বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু এর প্রভাব গভীর। নারীকর্মী নিজেকে অস্বস্তিকর মনে করতে পারেন। মিটিং বা প্রেজেন্টেশনে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। কাজের বদলে বাহ্যিকতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ে।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘অবজেক্টিফিকেশন’। যেখানে একজন মানুষকে তার কাজ বা চিন্তার বদলে তার শরীর বা চেহারা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও কর্মদক্ষতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

দ্বৈত মানদণ্ড

একই অফিসে পুরুষকর্মী যদি আনফরমাল পোশাক পরে আসেন, সেটি হয়তো ‘ক্যাজুয়াল’ বা ‘কমফোর্টেবল’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নারী কর্মীর পোশাক নিয়ে শুরু হয় বিশ্লেষণ এটি কি বেশি আধুনিক? বেশি রঙিন? বেশি সাধারণ? এই দ্বৈত মানদণ্ড নারীর ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করে। তাকে কাজের পাশাপাশি নিজের পোশাক নিয়েও সচেতন থাকতে হয়, কেউ যেন কিছু না বলে।

নেতৃত্বে নারীরা

বিশ্ব রাজনীতি ও করপোরেট জগতে অনেক নারী নেত্রী তাদের দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করেছেন পোশাক নয়, সিদ্ধান্তই একজন নেতার পরিচয়। যেমন: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিশিষ্ট জার্মান রাজনীতিবিদ অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, নিউজিল্যান্ড লেবার পার্টির ১৭তম সহ-সভাপতি জেসিন্ডা আর্ডার্ন। তাদের পোশাক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে তারা স্মরণীয় হয়েছেন তাদের নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ ও সংকট মোকাবিলার জন্য।

সামাজিক মাধ্যম ও নতুন চাপ

বর্তমান সময়ে সামাজিকমাধ্যম কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলছে। অফিস ইভেন্ট, করপোরেট ফটোশুট, লিংকডইন প্রোফাইল সব জায়গায় ‘প্রেজেন্টেবল’ হওয়ার চাপ। নারীরা প্রায়ই দ্বিধায় থাকেন খুব সাধারণ হলে কি কম আত্মবিশ্বাসী মনে হবে? খুব ফ্যাশনেবল হলে কি সিরিয়াস মনে করা হবে না? এই অদৃশ্য মানসিক টানাপোড়েন কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।

পেশাদারিত্ব মানে কী?

পেশাদারিত্ব মানে সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজের সক্ষমতা। এর কোনোটিই পোশাকের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। পোশাক অবশ্যই পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশ উপযোগী হওয়া উচিত, কিন্তু সেটিই কারও দক্ষতার মাপকাঠি হতে পারে না।

ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সচেতন কর্মসংস্কৃতি: প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পষ্ট নীতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কর্মীর কাজ ও আচরণ মূল্যায়নের মূল বিষয় হবে, পোশাক নয়। সংবেদনশীল নেতৃত্ব: ম্যানেজার ও টিম লিডারদের উচিত লুকিং শেমিং বা অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য নিরুৎসাহিত করা। নারীদের আত্মবিশ্বাস: নারীদেরও প্রয়োজন নিজের দক্ষতায় আস্থা রাখা। কেউ যদি পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন, সেটিকে নিজের যোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে না দেখা। সহকর্মীদের দায়িত্ব: সহকর্মী হিসেবে আমাদেরও সচেতন হওয়া জরুরি আমরা কী নিয়ে মন্তব্য করছি? একজন সহকর্মীর কাজ, নাকি তার বাহ্যিকতা? আরও পড়ুন: অদৃশ্য ট্রমা, দৃশ্যমান প্রভাব স্তন্যদানকারী মায়ের রোজা রাখা নিয়ে যা বলছেন চিকিৎসক নারী দিবসের অঙ্গীকার

আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেবল প্রতীকী উদযাপন নয়। এটি আমাদের ভাবতে শেখায় আমরা কি সত্যিই সমান দৃষ্টিতে নারীদের দেখছি? আমরা কি কর্মক্ষেত্রে তাদের কাজকে যথাযথ মূল্য দিচ্ছি?

পোশাক একজন মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়। কিন্তু পারফরম্যান্স তার পরিশ্রম, মেধা ও দক্ষতার প্রতিফলন।

৮ মার্চের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক কর্মক্ষেত্রে নারীদের পরিচয় হবে তাদের কাজ, সিদ্ধান্ত ও অবদান দিয়ে। পোশাক নয়, পারফরম্যান্সই হোক নারীর প্রকৃত পরিচয়। সমতার লড়াই শুরু হয় মানসিকতার পরিবর্তন দিয়ে। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে আজই; আমাদের অফিস, আমাদের ডেস্ক, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

তথ্যসূত্র: আইএমডি অরগ্যানাইজেশন

জেএস/