বুশরা আজমী‘মেয়ে হয়ে এত রাতে বাইরে কেন?’ প্রশ্নটি আজো বাংলাদেশের অসংখ্য নারীর কানে ধাক্কা দেয়। একই সমাজ আবার ৮ মার্চে ফুল তুলে বলে, ‘নারী শক্তি, নারী সম্ভাবনা।’ তাহলে কি সম্ভাবনা কেবল পোস্টারের ভাষা, আর নিরাপত্তা কেবল প্রতিশ্রুতির শব্দ?
গত কয়েকদিনের ধর্ষণের ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে উদযাপনের আলোর নিচেও অন্ধকার থাকে। ক্ষোভ জাগে, প্রতিবাদ ওঠে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় বয়ে যায়। তারপর? কয়েকদিন পরই ঘটনাটি পরিসংখ্যানের সারিতে ঠাঁই পায়। ভুক্তভোগী থেকে যায় সামাজিক প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়ে; অপরাধী অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে সময় পায়, সাহস পায়। বিচার বিলম্বিত হলে অন্যায়ের শক্তি বাড়ে এ সত্য আমরা বহুবার দেখেছি।
অথচ বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষায়, অর্থনীতিতে, প্রশাসনে। পোশাকশিল্পে তাদের শ্রম রপ্তানি আয়ের ভিত্তি মজবুত করেছে; গ্রামে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শহরে কর্পোরেট নেতৃত্ব নারীর উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী। বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্যও বাড়ছে। এই অগ্রযাত্রা কেবল সংখ্যার নয়, মানসিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায় এই অগ্রগতি কতটা নিরাপদ?
যে দেশে একজন নারী রাতে একা চললে উদ্বেগ ‘স্বাভাবিক’ ধরা হয়, সেখানে নিরাপত্তাহীনতা কোনো ব্যক্তিগত ভয় নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, ভুক্তভোগীর ওপর সামাজিক কলঙ্কের চাপ, প্রভাবশালীর ছায়া এসব মিলে অন্যায়কে দ্বিগুণ শক্তি দেয়। আইনের কড়াকড়ি ঘোষণায় সমাধান আসে না, যদি প্রয়োগে নিরপেক্ষতা ও দ্রুততা না থাকে। ন্যায়বিচার কেবল রায় নয়; এটি সময়মতো রায়।
সমস্যার শিকড় মানসিকতায়ও। আমরা ছেলেকে স্বাধীনতার ভাষা শেখাই, মেয়েকে সতর্কতার। ছেলেকে বলি এগিয়ে যেতে, মেয়েকে বলি সাবধানে থাকতে। এই দ্বৈততা থেকেই বৈষম্যের বীজ জন্ম নেয়। শিক্ষা, পরিবার ও গণমাধ্যমে সম্মান-সমতার চর্চা না বাড়লে আইনও একা পারে না। নারীর নিরাপত্তা মানে কেবল রাস্তায় টহল নয়; কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা, শিক্ষাঙ্গনে সুরক্ষা, অনলাইনে হয়রানি থেকে রক্ষা সবই এর অংশ।
তবু নারীর গল্প কেবল ভুক্তভোগিতার নয়। প্রতিকূলতা ভেঙে উঠে দাঁড়ানো অসংখ্য নারী আজ পরিবর্তনের মুখ। নির্যাতনের গণ্ডি পেরিয়ে উদ্যোক্তা হওয়া নারী, সংসারের চাপ সামলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা তরুণী, বৈষম্য ভেঙে নেতৃত্বে ওঠা কর্মকর্তা-তাদের সাফল্য দেখায়, সুযোগ পেলে নারী কেবল সমান নন, অনেক সময় অগ্রগামী। এই শক্তিকে স্বীকৃতি মানে কেবল প্রশংসা নয়; কাঠামোগত সমর্থন নিরাপদ পরিবেশ, সমান মজুরি, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন সুবিধা, অভিযোগ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ উন্নয়নের গল্প বলতে ভালোবাসে প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো, ডিজিটাল অগ্রগতি। কিন্তু অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থাকে। নারীর ক্ষমতায়ন দয়া নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক টেকসইতার শর্ত। নারী নিরাপদ হলে পরিবার নিরাপদ হয়; পরিবার নিরাপদ হলে সমাজ শক্তিশালী হয়; সমাজ শক্তিশালী হলে রাষ্ট্র স্থিতিশীল হয়।
৮ মার্চ তাই কেবল উদযাপনের দিন নয় জবাবদিহির দিন। রাষ্ট্রকে জিজ্ঞেস করার দিন: দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত হচ্ছে কি? কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি? ভুক্তভোগীকেই কেন বারবার প্রমাণ করতে হয় যে সে নির্দোষ? ‘আবেগ নয়, নীতিগত দৃঢ়তা’ এখন সময়ের দাবি।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো মেয়ে স্বপ্নের আগে নিরাপত্তার হিসাব কষবে না। যেখানে তার কণ্ঠ উচ্চারণ করলে তাকে চুপ করানো হবে না। যেখানে নেতৃত্বে নারী দেখা ব্যতিক্রম নয়, স্বাভাবিক দৃশ্য। এই লক্ষ্য অসম্ভব নয় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামাজিক সাহস।
ফুলের ভাষা নয়, ন্যায়ের ভাষা চাই। প্রতীক নয়, সুরক্ষা চাই। প্রশংসা নয়, সমতা চাই। ৮ মার্চ কাগজের তারিখ হয়ে থাকুক এটা আমরা চাই না। আমরা চাই, এটি হোক রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, সামাজিক চুক্তি ও প্রজন্মগত দায়িত্বের দিন। কারণ প্রশ্নটি এখনো রাস্তায় ভেসে আসে‘মেয়ে হয়ে এত রাতে বাইরে কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর বদলাতে না পারলে, আমাদের উন্নয়নকথা অসম্পূর্ণই থাকবে। আর উত্তর বদলানোর সময় এখনই।লেখক: সমাজকর্ম বিভাগ,৩য় বর্ষ, সহযোগী সদস্য, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টাস ইউনিটি, রাজশাহী কলেজ।
আরও পড়ুননারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে, কী ভাবছে এই প্রজন্ম?নারীবাদে নারীর প্রকৃত অবস্থান বনাম পুরুষতান্ত্রিক দ্বিচারিতা
কেএসকে