বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজন জ্যেষ্ঠ নেতা। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। এই পদে মেয়রের ক্ষমতা ও কার্যাবলি পরিচালনা করবেন তিনি।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ডিএসসিসির বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নগর ভবনে আব্দুস সালামের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মুসা আহমেদ।
জাগো নিউজ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আপনিই প্রথম ‘রাজনৈতিক প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ পেলেন। নতুন দায়িত্ব কেমন লাগছে?
আব্দুস সালাম: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে দক্ষিণ সিটির নাগরিক সেবা কার্যক্রম সঠিকভাবে চালিয়ে নিতে আমাকে প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবো। নাগরিকেরা তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পেলেই আমার ভালো লাগবে।
জাগো নিউজ: ঢাকায় যখন মশার উপদ্রব ব্যাপক, সে সময়ে আপনি প্রশাসকের দায়িত্ব নিলেন। মশক নিধনে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
আব্দুস সালাম: নগরে মশার সমস্যাটা নতুন নয়। এটা তো অনেক বছর ধরেই চলছে। এখন লক্ষ্য একটাই—মশার প্রজনন পর্যায়েই ধ্বংস করা। এজন্য সিটি করপোরেশন খাল, বিল, ঝিল, ড্রেন, নালা পরিষ্কারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যে মশক নিধনে ডিএসসিসিকে ১০টি ভাগে ভাগ করেছি। প্রতিটি ভাগে একটি করে মশক নিধন টিম বা দল গঠন করা হয়েছে। আমাদের কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের লোকজন এই টিমগুলোতে আছেন। তারা সারাক্ষণ পুরো নগর মনিটর করবেন।
এছাড়া মশক নিধনে সব ওয়ার্ডে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় যেখানে মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানেই ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। তবে মশক নিধনে আমাদের জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো।
জাগো নিউজ: নাগরিকদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটায় না। আবার যেখানেই ওষুধ ছিটায়, মশা মরে না। মশার ওষুধের মান যাচাইয়ে কোনো উদ্যোগ নেবেন?
আব্দুস সালাম: মশক নিধনে ব্যবহৃত ওষুধের মান নিয়ে আগেও বিতর্ক হয়েছিল। ২০১৯ ও ২০২৩ সালে ঢাকায় মশার ভয়াবহতা আমরা দেখেছি। এবার আমরা বিষয়টা খুব সিরিয়াসলি দেখছি। বর্তমানে যে ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে, সেটি মন্ত্রণালয় থেকেও পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে, আমরা নিজেরাও পরীক্ষা করছি। আমাদের কাছে প্রায় এক বছরের ওষুধ মজুত আছে। সেগুলোর গুণগত মান পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে। রিপোর্টে যদি দেখা যায় যে ওষুধ কার্যকর নয়, তাহলে নতুন ওষুধ ব্যবহার করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।
হকার উচ্ছেদ এক সংবেদনশীল বিষয়। হকারদেরও জীবিকা আছে, আবার নগরবাসীর চলাচলের অধিকারও আছে। এখন ঈদ সামনে রেখে তাদের উচ্ছেদ করলে দেখা যাবে নগর ভবন ঘেরাও করবে তারা। তাই ঈদ সামনে রেখে মানবিক কারণে তাদের ছাড় দেওয়া হয়েছে
জাগো নিউজ: আগে মাঠপর্যায়ে মশক নিধনসহ নাগরিক সেবা কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। গণঅভ্যুত্থানের পর সব কাউন্সিলরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক যোগাযোগে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এটি কীভাবে সামাল দেবেন?
আব্দুস সালাম: রাজনৈতিক প্রশাসক হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বাড়ানো। এই কাজ প্রশাসন একা করতে পারবে না। যুবক, স্কাউট, সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক—সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। জনগণ যখন অংশগ্রহণ করবে, তখনই নগরের সমস্যাগুলো সমাধান করা সহজ হবে।
জাগো নিউজ: গুলিস্তান, নিউমার্কেট এলাকাসহ ঢাকার ফুটপাত ও সড়ক দখল করে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসছেন হকাররা। এতে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কে নিয়মিত তীব্র যানজট হয়। এ অবস্থায় হকার উচ্ছেদে আপনার অবস্থান কী?
আব্দুস সালাম: হকার উচ্ছেদ এক সংবেদনশীল বিষয়। হকারদেরও জীবিকা আছে, আবার নগরবাসীর চলাচলের অধিকারও আছে। এখন ঈদ সামনে রেখে তাদের উচ্ছেদ করলে দেখা যাবে নগর ভবন ঘেরাও করবে তারা। তাই ঈদ সামনে রেখে মানবিক কারণে তাদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ঈদের আগ পর্যন্ত আমরা হকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবো। ঈদের পরে হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে কোথায় কীভাবে তাদের পুনর্বাসন করা যায়, সেটা নির্ধারণ করা হবে।
জাগো নিউজ: গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা দক্ষিণের অনেক মার্কেট, কমিউনিটি সেন্টারের অবকাঠামো উন্নয়ন বন্ধ। নগরের রাস্তাঘাটেরও বেহাল অবস্থা। খানাখন্দে ভরা। এসব অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ শুরু করবেন কি না?
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এতদিন কার্যত বেওয়ারিশ অবস্থায় ছিল। দেখার মতো কেউ ছিল না। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ; যেটা হচ্ছে অরিজিনাল ঢাকা, সেই এলাকার প্রতি যে মনোযোগ দরকার ছিল, তা আমরা পাইনি। এখন আর সেই অবস্থা নেই। ঢাকা দক্ষিণ বেওয়ারিশ নয়
আব্দুস সালাম: গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ আমলের অনেক ঠিকাদার কাজ রেখে পালিয়েছেন। তাদের শেষ সুযোগ দেওয়া হবে। এরপরও কাজ না করলে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থায় যেতে হবে। এখন মশক নিধন আমাদের প্রথম টার্গেট। ঈদের পর নগরে অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষভাবে নজর দেবো।
জাগো নিউজ: নগরে খেলার মাঠ-পার্ক সংকুচিত হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় সিটি করপোরেশনের জায়গা বেদখলে আছে। এসব জায়গা দখলমুক্ত করা কতটা বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন?
আব্দুস সালাম: আগে মানুষ মাঠ দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতো। এখন সেই সচেতনতা কমে গেছে। মাদক কমানো, তরুণদের খেলাধুলায় ফেরানো—এই দুটো একসঙ্গে না হলে মাঠ রক্ষা করা যাবে না। আমরা সিটি করপোরেশনের বেদখল হওয়া জায়গাগুলো উদ্ধার করে মাঠ-পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেবো। বিদ্যমান পার্ক-মাঠগুলোও খেলাধুলার উপযোগী করবো।
জাগো নিউজ: গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারের বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের আমলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ওই প্রশাসকেরা শুধু রুটিন দায়িত্ব পালন করেছেন। জনগণের সেবা সংক্রান্ত বড় সিদ্ধান্তের কোনো কাজে হাত দেননি। এক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী হবে?
আব্দুস সালাম: আমি দ্বিধা না করে বলছি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এতদিন কার্যত বেওয়ারিশ অবস্থায় ছিল। দেখার মতো কেউ ছিল না। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ; যেটা হচ্ছে অরিজিনাল ঢাকা, সেই এলাকাটার প্রতি যে মনোযোগ দরকার ছিল, তা আমরা পাইনি। এখন আর সেই অবস্থা নেই। ঢাকা দক্ষিণ বেওয়ারিশ নয়। আমরা চাই পুরান ঢাকাসহ নগরের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পরিচিত রূপ আবার ফিরিয়ে আনতে।
জাগো নিউজ: দক্ষিণ সিটি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?আব্দুস সালাম: আমার প্রধান লক্ষ্য হলো ঢাকা দক্ষিণকে আবার মানুষের শহর হিসেবে গড়ে তোলা। পরিচ্ছন্নতা, মশা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা ও জনসচেতনতা—এই জায়গাগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চাই। আমরা চাই না, শুধু কাগজে-কলমে সিদ্ধান্ত থাকুক। মাঠে কাজ হোক, মানুষ যেন পরিবর্তনটা চোখে দেখে।
জাগো নিউজ: জাগো নিউজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আব্দুস সালাম: জাগো নিউজকেও ধন্যবাদ।
এমএমএ/এএসএ