ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় গ্রিসে এসেও নির্ধারিত কাজ না পেয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অন্তত শতাধিক বাংলাদেশি। প্রতিশ্রুত নিয়োগকর্তা না থাকায় ভিসার নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ায় অনেকেই এরই মধ্যে অবৈধ হয়ে পড়ছেন। অসাধু মালিক ও দালালদের প্রতারণায় বিপাকে পড়ে দূতাবাসের দ্বারস্থ হয়েছেন এসব বাংলাদেশি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে গ্রিসে নির্দিষ্ট কোম্পানিতে ভালো বেতনে কাজের ভিসা ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় দালালরা। কিন্তু গ্রিসে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, প্রতিশ্রুত নিয়োগকর্তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালরা গ্রিসের বিভিন্ন গ্রামের কিছু কৃষি জমির মালিকদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১০০০ ইউরোর বিনিময়ে শুধু কাগুজে ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ করে। ওই পারমিট ব্যবহার করে ভিসার জন্য আবেদন করা হয়। কিন্তু ভিসা অনুমোদনের পর গ্রিসে পৌঁছালে চাকরির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পান না প্রবাসীরা।
ফলে নির্ধারিত সময়ের পর অনেকেই হয়ে যান অবৈধ। চুক্তিভিত্তিক এই ভিসায় ১ বছর পর পর নবায়ন করে ৫ বছর পর্যন্ত থাকা যায়, যদি একই নিয়োগকর্তা থাকে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা শতাধিক। কোনো উপায় না পেয়ে অনেকেই এরই মধ্যে পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপের অন্যদেশে।
এদেরই একজন আসিফ মিয়া বলেন, ‘দালালের মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ টাকা দিয়ে গ্রিসে আসি। বলা হয়েছিল একটি কৃষি খামারে কাজ পাবো। কিন্তু এখানে এসে দেখি ওই মালিকের কোনো খোঁজই নেই। এখন কাজও নেই, কাগজও নেই।’
প্রতারণার শিকার ইব্রাহিম হোসেন জানান, বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় বলা হয়েছিল মাসে অন্তত ১২০০ ইউরো বেতন পাবো। কিন্তু এখানে এসে দেখি যে কোম্পানির নামে ভিসা হয়েছে, সেই কোম্পানির কোনো অফিসই নেই।
নাসিম হোসেন বলেন, ‘গ্রিসে এসেছি ১১ মাস হয়ে গেছে, দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ফোনও ধরছে না। যে মালিকের ভিসায় এসেছি ওই মালিক আমাদের পারমিট নবায়ন না করলে ভিসা বাতিল, ১ মাস পর অবৈধ হয়ে যাবো। এখন কী করবো বুঝতে পারছি না।’
রনি হোসেন বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে দূতাবাসে অভিযোগ দিয়েছি। আশা করছি দূতাবাস আমাদের বিষয়ে কিছু করবে।’
এরই মধ্যে অন্তত ৩০ জন ভুক্তভোগী এথেন্সে বাংলাদেশ দূতাবাসে অভিযোগ দিয়েছেন এবং আইনি সহায়তা চেয়েছেন।
এ বিষয়ে এথেন্সস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মার্জিয়া সুলতানা বলেন, ‘বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ভিসা গ্রিসে এসে তারা প্রতিশ্রুত নিয়োগকর্তাকে পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে কয়েকজন দূতাবাসে যোগাযোগ করেছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে রাষ্ট্রদূত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়াও বিষয়টি সমাধানের জন্য দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সচেতন মহল বলছে, বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগকর্তার বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট মানিক হোসেন বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় শুধু কাগজের ওপর ভিত্তি করে ভিসা করা হয়। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগকর্তা, চুক্তিপত্র এবং কাজের প্রকৃতি ভালোভাবে যাচাই করা খুবই প্রয়োজন।’
বিদেশে ভালো কাজ ও আয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসা এসব বাংলাদেশিরা এখন দালাল চক্রের প্রতারণায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তাদের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এই প্রতারণার শিকার প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করুক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি সই হয়। তবে বাংলাদেশে গ্রিক দূতাবাস না থাকায় এই প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলেও সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দালাল চক্র প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বৈধ কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে তারা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
এমআরএম/এএসএম