লাইফস্টাইল

মা-বাবার অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কি সন্তানের উপকারে আসে

স্বপ্ন মানুষের চালিকাশক্তি। স্বপ্ন ও আশা-আকাঙ্ক্ষা আমাদের পরিশ্রম করার শক্তি যোগায়। দুঃখ-কষ্টের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখায়। তাই প্রতিটি মানুষেরই স্বপ্ন থাকা উচিত। তবে সেই স্বপ্নের মাত্রা এমন হওয়া উচিত নয় যেটি, আমাদের সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার গলায় লোহার শিকল বেঁধে দেয়।

সন্তান অর্থনৈতিকভাবে তার মা-বাবা বা অভিভাবকের ওপর নির্ভরশীল। আবার অনেক পরিবারের ছোট ভাই-বোন বড় ভাই বা বোনের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল থাকে।

টাকা-পয়সার দায়িত্ব অভিভাবককেই বহন করতে হয়। আমাদের সমাজে কিছু অভিভাবক আছেন, যারা সন্তানকে নিয়ে অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ছোট ভাই-বোনকে নিয়েও অতিমাত্রায় বড় বড় স্বপ্ন দেখেন। যে শিশু বা কিশোরের পক্ষে হয়তো কোনো বিষয় অর্জন করা সম্ভব নয় বা করা কঠিন, সেই বিষয় নিয়েই তার ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন।

সন্তান বা ভাই-বোন সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পেরে অনেক সময় হীনমন্যতা বা হতাশায় ভুগতে থাকেন। হয়তো কারও সন্তান অঙ্ক করতে পছন্দ করে না, বাণিজ্য বা মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু সেই সন্তানের মা-বাবা জোর করে তাকে বিজ্ঞান বিভাগেই পড়াতে চান।

যেখানে সন্তান বাণিজ্য বিভাগের বিষয়ে পড়াশোনা করতে চায়, সেখানে হয়তো মা-বাবা বা অভিভাবক স্বপ্ন দেখছেন যে সন্তান একদিন পৃথিবীখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার হবে।

আমাদের সমাজে এই ধরনের অভিভাবকের কোনো অভাব নেই। শুধুমাত্র ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যারিস্টাররাই সমাজের উন্নতি করেন; আর অন্য কোনো পেশার মানুষ সমাজের উপকারে আসে না বা সম্মানজনক নয় - এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে সন্তানকে বোঝাতে হবে। পরিবারের সদস্যদের অর্থনৈতিক অবস্থা, সক্ষমতা, পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা - সব কিছুর মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন।

আবার কোনো পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা নেই বলেই সেই পরিবারের ছেলে বা মেয়েটি ভালো কোনো বিষয়ে পড়লে কখনো ভালো ফলাফল করতে পারবে না - এই ধরনের চিন্তাভাবনাও সঠিক নয়।

সন্তানের খুব ভালো বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তার মন বুঝে চলতে পারলে অভিভাবক ও ছেলে-মেয়েদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হবে। সন্তানকে নিয়ে অবশ্যই সব মা-বাবা ও অভিভাবকের স্বপ্ন থাকে, কিন্তু অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে যেন মা-বাবা তাদের সন্তানকে অপমান বা অপদস্থ না করেন - সেই বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

অনেক মা-বাবাকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমাকে অনেক টাকা দিয়ে গান শেখাচ্ছি, তোমাকে দেশসেরা গায়িকা হতেই হবে।’ অথবা ‘তোমাকে এত দামী স্কুলে পড়াচ্ছি, তোমাকে দেশসেরা শিক্ষার্থী হতেই হবে। নয়তো তোমাকে স্কুলে পড়াব না, স্কুলের বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেব।’ অথবা ‘বাসা থেকে বের করে দেব, মেরে পিঠের চামড়া তুলে ফেলব।’

এই ধরনের কথা অসংখ্য অভিভাবকের মুখে শোনা যায়, যার পরিণাম অধিকাংশ সময়েই হয় হিতে বিপরীত।

আবার অনেক অভিভাবক সবার সামনে সন্তানের খারাপ ফলাফল নিয়ে অতিমাত্রায় খারাপ আচরণ করেন, যার পরিণামও ভালো হয় না।

শিশু-কিশোরদেরও আত্মসম্মানবোধ থাকে। বাবা-মায়ের অতিমাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে কোনো সন্তানকেই অন্যায়ভাবে আঘাত করা, চড়-থাপ্পড় মারা উচিত নয়।

আমরা আমাদের সন্তানের যত ভালো বন্ধু হতে পারব, সন্তানের মন উপলব্ধি করা আমাদের জন্য ততটাই সহজ হবে।

অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে মানসিক দূরত্ব কমে এলে জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়ে উঠবে।

এএমপি/এমএস