মতামত

নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাতকে সুরক্ষা দিন

দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি করেন ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পো-উদ্যোক্তারা। গ্রাম থেকে শহর সব জায়গায় এসএমই উদ্যোগই পরিবারে আয় আনে, বাজার সচল রাখে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায়। সহজভাবে বললে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা বলা হয় এসএমই খাতকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই খাতটি আজ উচ্চ সুদের চাপে ন্যুব্জ। এমন বাস্তবতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দেশ পরিচালনায়। সরকারের বর্তমান অর্থমন্ত্রী নিজে একজন সফল ব্যবসায়ী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা জাগে- তারা এসএমই খাতের যন্ত্রণা বুঝবেন। আমি একজন ক্ষুদ্র শিল্পো-উদ্যোক্তা হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও গভর্নরসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানাচ্ছি, এসএমই খাতে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হোক।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিগত কয়েক বছরে দেশের কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ঋণের সুদহার বেড়েছে। পাশাপাশি ঋণ বিতরণও কমে এসেছে। ফলে অর্থায়ন সংকটে পড়েছেন অনেক এসএমই উদ্যোক্তা। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কর্মসংস্থানও। অথচ দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখের বেশি কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই খাতে ৩ কোটির বেশি জনবল কাজ করছে। যা দেশের মোট শিল্প কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫%। দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৩০-৩২%। যা দারিদ্র্য বিমোচন ও সুষম উন্নয়নে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যাংকগুলোতে এখন এসএমই ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। চড়া সুদ থাকায় এসএমই খাতে প্রসারতার গতি কমে এসেছে। অনেক ব্যাংক ইতোমধ্যে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ২০২০ সালে এসএমইসহ সব ঋণে সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন মন্দা কাটাতে পাশাপাশি বিভিন্ন ঋণ প্যাকেজও দেওয়া হয়। ফলে এসএমই খাত অনেকটা ঘুরে দাঁড়ায়। তবে ২০২২ সালে সুদহার বাজারভিত্তিক করা ও ডলারের দাম বাড়ার কারণে ছোট উদ্যোক্তারাজ চাপে পড়েন। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে আর কোনো সহায়তাও দেওয়া হয়নি। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ কমিয়ে দেয়।

এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, এসএমই উদ্যোক্তার মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ঋণের আওতায় রয়েছে। অর্থাৎ এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ও পরিধি দুটোই কম। শুধু তাই নয়, ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ এসএমই খাতে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। তবে এ খাতে ঋণ রয়েছে ১৮ শতাংশের কম। এ খাতে ঋণ বাড়ার পরিবর্তে উল্টো কমে আসছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, এ খাতের ঋণের ২৫ শতাংশের অর্ধেক দিতে হবে কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে। মোট ঋণের মধ্যে উৎপাদনশীল শিল্পে অন্তত ৪০ শতাংশ, সেবায় ২৫ শতাংশ এবং বাকি ৩৫ শতাংশ ব্যবসা উপখাতে বিতরণ করতে হবে। নারী উদ্যোগে দিতে হবে অন্তত ১৫ শতাংশ। যদিও এ ক্ষেত্রেও উৎপাদন ও সেবার তুলনায় ব্যবসায় বেশি ঋণ দিতে আগ্রহ দেখা যায়।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি- সব মিলিয়ে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিছুটা সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। ব্যাংক ঋণের সুদ যদি ১২-১৪ শতাংশের ঘরে থাকে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, পণ্যের দাম বাড়ে এবং শেষপর্যন্ত ভোক্তাকেই বেশি মূল্য দিতে হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে সুদের হার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাজারে তারল্য ও সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কিন্তু এসএমই খাতের জন্য আলাদা সহনশীল নীতি প্রয়োজন। উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে বিশেষ তহবিল থাকে। কারণ সরকার জানে- এসএমই টিকলে অর্থনীতি টিকবে। অর্থমন্ত্রী একজন ব্যবসায়ী হিসেবে নিশ্চয়ই জানেন, উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় ভয় হলো ‘ক্যাশ ফ্লো’। সময়মতো বিক্রি না হলে কিস্তি পরিশোধ করা যায় না। উচ্চ সুদের কারণে কিস্তির চাপ বাড়লে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একবার কোনো ছোট কারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিক নয়, তার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক পরিবারও বিপদে পড়ে। এতে বেকারত্ব বাড়ে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ব্যাহত হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, বাজার সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। দেশীয় পণ্যের জন্য সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার এবং রপ্তানিতে বিশেষ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও জরুরি। নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এসএমই খাত বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে- এই উপলব্ধি থেকে দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।

অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো প্রায়ই এসএমই খাতে ঋণ দিতে অনীহা দেখায়। কারণ তাদের মতে ঝুঁকি বেশি। কিন্তু ঝুঁকি কমাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে গ্যারান্টি স্কিম চালু করতে পারে। আংশিক ক্রেডিট গ্যারান্টি থাকলে ব্যাংকের ঝুঁকি কমবে, উদ্যোক্তাও সহজে ঋণ পাবে। সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামালে ঋণ গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, খেলাপি কমবে এবং ব্যবসার পরিধি বাড়বে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে অনেক সময় কড়াকড়ি মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই উচিত। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতি। এখানে উদ্যোক্তা তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। স্বল্পসুদে ঋণ দিলে সরকার রাজস্ব হারাবে না; বরং ব্যবসা বাড়লে কর আদায়ও বাড়বে। কর্মসংস্থান বাড়লে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ও কমবে।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে- সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামালে ব্যাংকগুলো কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে? উত্তর হলো, সঠিক কাঠামো থাকলে নয়। সরকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বাড়াতে পারে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কম সুদে তহবিল দিতে পারে, ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রেডিট স্কোরিং উন্নত করা গেলে ঝুঁকি কমবে।

আমরা অতীতে দেখেছি, বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার কৃষি ও রপ্তানি খাতে প্রণোদনা দিয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন এসএমই খাতের জন্য স্থায়ী স্বল্পসুদ নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে।

অর্থমন্ত্রীর ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানেন বাজারের ভাষা, উদ্যোক্তার মানসিকতা, বিনিয়োগের ঝুঁকি। তাই মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে প্রত্যাশা বেশি। এটি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, রাজনৈতিকভাবেও তা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সমাজের বৃহৎ ভোটারগোষ্ঠী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশ।

সিঙ্গেল ডিজিট সুদ মানে কেবল ৯ শতাংশ নয়; এটি আস্থার বার্তা। এটি বলবে-রাষ্ট্র উদ্যোক্তার পাশে আছে। যখন একজন তরুণ নতুন ব্যবসা শুরু করবে, সে জানবে তার পেছনে সহায়ক নীতি রয়েছে। এতে স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, উদ্ভাবন বাড়বে, আমদানি নির্ভরতা কমবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এ খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু উচ্চ সুদের হার, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে বর্তমানে এসএমই খাত কঠিন সময় পার করছে। এই বাস্তবতায় সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বাড়িয়ে প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে সরাসরি ঋণ পৌঁছানো জরুরি। ব্যাংকগুলো যেন জামানতের কঠোর শর্ত শিথিল করে, সে বিষয়ে কার্যকর নির্দেশনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কর ও ভ্যাট নীতিতে সাময়িক ছাড় দেওয়া যেতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেন টিকে থাকতে পারে, সে জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ট্যাক্স রিবেট বা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা উচিত। এতে বাজারে নগদ প্রবাহ বাড়বে এবং উৎপাদন সচল থাকবে।

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ব্যাহত হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, বাজার সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। দেশীয় পণ্যের জন্য সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার এবং রপ্তানিতে বিশেষ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও জরুরি। নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এসএমই খাত বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে- এই উপলব্ধি থেকে দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।

আমি মনে করি, এসএমই খাতকে টিকিয়ে রাখা মানে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্ত করা। অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ী মানুষ, তাই তারা নিশ্চয়ই বুঝবেন সুদের চাপ কমলে ব্যবসা বাড়ে, ব্যবসা বাড়লে অর্থনীতি শক্ত হয়। দেশের স্বার্থে, কর্মসংস্থানের স্বার্থে, টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে- এসএমই ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিট করা হোক।

লেখক : কলামিস্ট ও শিল্প-উদ্যোক্তা।

এইচআর/জেআইএম