দেশজুড়ে

প্রকৌশলী-ঠিকাদারের যোগসাজশে অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

গাইবান্ধায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের দুইটি লেবার শেড সংস্কার কাজের নামে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কাগজ-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে নামমাত্র দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে। সওজ বিভাগের প্রকৌশলী ও ঠিকাদার যোগসাজশে এ টাকা আত্মসাতের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তথ্য বাতায়ন অধিকার আইনে দেওয়া তথ্যে জানা যায়, গাইবান্ধা সড়ক ও জনপথ বিভাগের দুইটি লেবার শেড (শ্রমিকদের থাকার ঘর) রয়েছে। একটি গাইবান্ধা জেলা শহরের শাপলাপাড়া এলাকায় এবং আরেকটি পলাশবাড়ী উপজেলা সদরে অবস্থিত। শেড দুইটি সংস্কারের জন্য চারটি অর্থবছরে চার দফায় ৪৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরমধ্যে শাপলাপাড়া এলাকার শেড সংস্কারের জন্য মোট ৩২ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। অর্থবছর অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের শেডের জন্য বরাদ্দ আসে মোট সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। লেবার শেড দুইটি সংস্কারের দায়িত্ব পান গাইবান্ধার ঠিকাদার মোস্তাক আহমেদ।

তথ্য বাতায়নে আরও বলা হয়, শাপলাপাড়া এলাকার শেডে সাতজন ও পলাশবাড়ীর শেডে ছয়জন কর্মচারী বসবাস করেন। শাপলাপাড়া এলাকার শেডে বসবাসকারীদের কাছ থেকে ২০২৫ সালের মে ও জুন মাসের ভাড়া থেকে ১১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পলাশবাড়ীর শেডে বসবাসকারিদের কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হয়।

গাইবান্ধা সওজ বিভাগের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তথ্য প্রদানের মন্তব্যের ঘরে লেখা, শাপলাপাড়া এলাকার শেডসমুহ বসবাসের অনুপোযোগি ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আংশিক মেরামতের কারণে ২০২৫ সালের মে মাসে বসবাসের উপযোগী হয়। কিন্তু এই শেড সংস্কারের জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই মন্তব্য করা হয় পলাশবাড়ী সদরের শেডের ক্ষেত্রেও। এই শেড সংস্কারের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এছাড়া তথ্য বাতায়নে শাপলাপাড়া এলাকার শেডসমুহ সংস্কারের জন্য ইটের গাঁথুনি, স্টিল অ্যাংগেল, সিআই শিট, প্লাস্টার, রং এবং এইচবিবির কাজ প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে পলাশবাড়ী সদরের শেড সংস্কারের জন্য টিনের ছাউনি, কাঠেল ফ্রেম, প্লাস্টার মেরামত, ও রং করণের মাধ্যমে স্থাপনা টেকসই করা সম্ভব বিধায় প্রাক্কলন প্রস্তুত করার কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে দুইটি শেডে এসব কাজের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক বিশিষ্ট আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম বলেন, লুটপাটের জন্যই প্রকৌশলী ও ঠিকাদার যোগসাজশ করে সরকারি আবাসিক ভবন সংস্কারের নামে তদবির করে বরাদ্দ আনেন। এসব অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্ত করে লুটপাটে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মো. মোস্তাক বলেন, ‘কাজ না করে বিল তোলা যায় না। কাজ হয়েছে মর্মে স্বাক্ষর নেওয়া আছে। কাজ বুঝে দিয়েই বিল পেয়েছি।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, গাইবান্ধা জেলা শহরের শাপলাপাড়া এলাকা থেকে খানকা শরীফের খাদ্য গুদামে যাতায়াত সড়ক ঘেঁষে অবস্থিত লেবারশেড (শ্রমিকদের থাকার ঘর)। স্থানীয় একটি মসজিদের পাশেই লেবারশেডের প্রধান ফটক। ভেতরে ঢুকতেই ফাঁকা মাঠ। মাঠের বামে একটি পুকুর। মাঠের চারদিকে চারটি আঁধাপাকা টিনশেড ঘর। ঘরগুলো অনেকটাই জরাজীর্ণ। কোনোটির প্লাস্টার উঠে যাচ্ছে, কোনোটির দেয়ালের রং উঠে গেছে। ঘরগুলোর দরজা-জানালা নড়বড়ে। লেবারশেড ঘুরে মেরামত কাজের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেবার শেডে বসবাসকারী সওজ বিভাগের এক কর্মচারীর দাবি, প্রায় তিন বছর যাবৎ এসব ঘরের কোনো মেরামত করতে দেখেননি। শুধু শুনি মেরামত করা হবে। মেরামত আর করা হয় না। অথচ বেতন-ভাতা থেকে আমাদের বাড়ি ভাড়া কর্তন করা হচ্ছে।

আরেক কর্মচারীর স্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, আপনারা বিল্ডিং দেখেন, কী কাজ হয়েছে। আমরা যে ঘরে থাকি, সে ঘরের দেওয়ালের রং উঠে গেছে। অনেক জায়গায় পলেস্তারা উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমার স্বামী ছোট পদে চাকরি করে। তাই আমরা কোনো প্রতিবাদ করতে পারি না।

স্থানীয় বাসিন্দা মিলন মিয়া বলেন, এসব ভবনে তিন-চার বছরের মধ্যে কাজ করতে দেখিনি। শুনেছি একই ভবন মেরামতের জন্য প্রতিবছর লাখ টাকা বরাদ্দ আনা হয়। কিন্তু মেরামত করতে দেখি না। শ্রমিকদের আবাসিক ভবন মেরামত করলে সবাই তা দেখতো। ভবন তো এখানেই আছে।

গাইবান্ধা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন বলেন, আমি আসার আগে কী কাজ হয়েছে, তা আমি বলতে পারবো না। এসব কাজ হলো এমন কাজ যে, এক বছর বা দুই বছর পার হলে কী কাজ হয়েছে, দেখে তা বোঝা যায় না।

তিনি দাবি করেন, আমার সময় ওই লেবার শেডের কাজ হয়েছে। ওখানে যারা থাকেন, কাজ হয়েছে মর্মে তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া আছে। মূল সমস্যা যারা ওখানে থাকেন, তারা নিজেরাই শুধু বলেন কাজ হয়নি।

আনোয়ার আল শামীম/এমএন/জেআইএম