কর্মক্ষেত্রে অনেক আচরণ প্রথমে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘মজা’ মনে হতে পারে। সহকর্মীর ব্যক্তিগত প্রশ্ন, অশোভন মন্তব্য, অযাচিত ঘনিষ্ঠতা বা বারবার অপমান - এসবকে অনেক সময় অফিসের সংস্কৃতি বলে এড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব আচরণ অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির পর্যায়ে পড়ে।
বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আইন ও নীতিমালার কিছু নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে বেশিরভাগ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোড অব কন্ডাক্ট বা আচরণবিধি থাকে, যেখানে কর্মীদের পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার নিয়ম নির্ধারিত থাকে।
তাই কর্মক্ষেত্রে সমস্যাগুলো সাধারণভাবে দুই ধরনের হতে পারে - আইনে নির্ধারিত যৌন হয়রানি এবং আচরণবিধি অনুযায়ী অসদাচরণ বা মানসিক হয়রানি।
বাংলাদেশের হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে কিছু আচরণ স্পষ্টভাবে যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে। যেমন -
>> অশ্লীল বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যসহকর্মীর শরীর, পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা বা কৌতুক করা।
>> অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শঅনুমতি ছাড়া স্পর্শ করা, খুব কাছাকাছি দাঁড়ানো বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা করা।
>> অশ্লীল ছবি বা কনটেন্ট শেয়ার করাকর্মক্ষেত্রে বা মেসেজে অশোভন ছবি, ভিডিও বা কনটেন্ট পাঠানো বা দেখানো।
>> সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়ে চাপ দেওয়াউর্ধ্বতন কেউ যদি সম্পর্কের প্রস্তাব দেন এবং তা প্রত্যাখ্যান করলে কাজের সুযোগ বা পদোন্নতিতে প্রভাব ফেলার ইঙ্গিত দেন, সেটিও যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে।
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এসব অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি অভিযোগ কমিটি থাকার কথা।
২. আচরণবিধি অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রের অসদাচরণসব আচরণ আইনে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ না থাকলেও অনেক আচরণ কর্পোরেট নীতিমালা অনুযায়ী অসদাচরণ হিসেবে ধরা হয়। এগুলোও কর্মক্ষেত্রে মানসিক হয়রানি তৈরি করতে পারে।
>> অতিরিক্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করাকারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিয়ে, আয় বা পারিবারিক বিষয় নিয়ে অযাচিত প্রশ্ন করা অনেক সময় ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন করে।
>> অপমানজনক বা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যসহকর্মীর কাজ, উচ্চারণ, পোশাক বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বারবার ব্যঙ্গ বা অপমান করা কর্মক্ষেত্রের শালীনতা নষ্ট করে।
>> সবার সামনে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাভুল বা দুর্বলতা নিয়ে প্রকাশ্যে কাউকে অপমান করা অনেক প্রতিষ্ঠানে ওয়ার্কপ্লেস বুলিং হিসেবে ধরা হয়।
>> গুজব ছড়ানো বা ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করাকোনো সহকর্মীকে নিয়ে গুজব ছড়ানো বা তাকে উদ্দেশ্য করে বিদ্রূপ মন্তব্য করা কর্মক্ষেত্রে শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
কখন অভিযোগ করবেনযদি কোনো আচরণ বারবার ঘটে এবং সেটি আপনার কাজের পরিবেশকে অস্বস্তিকর বা অপমানজনক করে তোলে, তাহলে সেটি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রথমে সরাসরি জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে এই আচরণ আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলছে। তাতেও পরিবর্তন না হলে প্রতিষ্ঠানের এইচআর বিভাগ বা অভিযোগ কমিটিতে বিষয়টি জানানো যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ তৈরি করা শুধু প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, কর্মীদের সচেতনতার ওপরও অনেকটাই নির্ভর করে। তাই কোনো আচরণ যদি সীমা অতিক্রম করে, সেটিকে ‘মজা’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে যথাযথভাবে জানানোই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
সূত্র: বাংলাদেশ হাইকোর্টের কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নির্দেশনা ২০০৯, বাংলাদেশ শ্রম আইন ও কর্মক্ষেত্র নীতিমালা বিশ্লেষণ, বিভিন্ন কর্পোরেট কোড অব কন্ডাক্ট নির্দেশিকা
এএমপি/এএসএম