আইন-আদালত

অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল (ত্রয়োদশ সংশোধনী) করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। আর ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা হবেন সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। তবে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতার আলোকে সংসদ যদি সরকার ব্যবস্থায় পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করে, তা হলে ভিন্ন কিছু হতে পারে বলে মত দিয়েছেন আইনজীবীরা।

বাংলাদেশের সংবিধানে বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ৭৪ পৃষ্ঠার রায় রোববার (১৫ মার্চ) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের লিখিত এই রায়ে বলা হয়েছে, সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায়টি ঘোষণা করেছিলেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত উল্লেখ করেছেন, চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। তবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বর্তমান সংসদ চাইলে এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংযোজন বা বিয়োজন করার ক্ষমতা রাখে।

এ বিষয়ে বিএনপির আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, এই রায় কোনো একক দলের নয় বরং পুরো জাতির জন্য একটি মাইলফলক। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেশের গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল, যা এই রায়ের মাধ্যমে সংশোধিত হলো।

১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত এই ব্যবস্থা ২০১১ সালে আপিল বিভাগের এক রায়ের প্রেক্ষিতে বিলুপ্ত করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হলে সর্বোচ্চ আদালত নতুন এই সিদ্ধান্ত দেন।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাত সদস্যের বিচারকের পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন— বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী (বর্তমান প্রধান বিচারপতি), বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।

রায়ের অনুলিপি প্রকাশের পর এমন মত দেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও মোহাম্মদ শিশির মনির।

সুপ্রিম কোর্টের ৭৪ পৃষ্ঠার এ রায়টি লিখেছেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। গত ২০ নভেম্বর ওই রায় দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত।

১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের দাবির মুখে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী হিসেবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই বছরের ২৭ মার্চ সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন ঘটে।

এ বিধান অনুসরণ করে ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচনগুলো নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানবহির্ভূত উল্লেখ করে আইনজীবী এম. সলিমউল্লাহসহ তিন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট করেন। শুনানির পর তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত ও বৈধ। এই সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ওই বছর রিট আবেদনকারীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন।

আপিলের শুনানি শেষে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ আপিল বিভাগের সাত সদস্যের নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে রায় দেন। এতে প্রধান বিচারপতিসহ চারজন বাতিলের পক্ষে ছিলেন।

২০১১ সালের ১০ মে দেওয়া রায়ে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অর্থাৎ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন অগণতান্ত্রিক এবং তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে তা বাতিলযোগ্য। তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

এই রায় ঘোষণার সাত দিন পর অর্থাৎ ১৭ মে অবসরে যান এ বি এম খায়রুল হক। অবসরে যাওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। তখন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রায় পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে।

পূর্ণাঙ্গ রায় থেকে ‘তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে’ এই পর্যবেক্ষণ বাদ দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে ২০১১ সালের বিতর্কিত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে গত বছর ২৭ আগস্ট আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ ব্যক্তি। পরে ১৭ অক্টোবর আবেদন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ ছাড়া নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনসহ আরও দুটি আবেদন করা হয়।

রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৭ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির বেঞ্চ আপিলের অনুমতি দেন। ২০ নভেম্বর সে আপিলের ওপর রায় দেন আপিল বিভাগ।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, এই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যে ফরম্যাটে ছিল, সেই ফরম্যাটে এটি পুনরুজ্জীবিত হলো। এটা কার্যকর হবে এই সংসদের ৫ বছর শেষে। এই সংসদ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে।

সংসদ এটিকে পরিমার্জন করতে পারে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ। আদালত পুনরুজ্জীবিত করেছেন। অর্থাৎ শেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন প্রধান উপদেষ্টা। এখন বর্তমান সংসদ যদি মনে করেন জুলাই সনদের আলোকে বা অন্য কোনোভাবে এই বিধানের মধ্যে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন বা সংশোধন করতে চান, তাহলে এটা সম্পূর্ণ সংসদের এখতিয়ারে। কারণ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করা যায়।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের রায় বাতিল করেছেন। খালেদা জিয়া যেটা করেছেন (১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার) সেটা ফিরিয়ে আনার রায় দিয়েছেন। এটা পরবর্তী নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে। যদি না স্বাধীন সার্বভৌম সংসদ পরিমার্জন না করেন। এ রায়টি সবার জন্য বাধ্যকর। তবে মনে রাখতে হবে সংসদ সংবিধান, আইনের যে কোনো ধারা সংশোধন বা পরিমার্জন করতে পারেন।

যেমন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া

১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ ভাগের ২ক পরিচ্ছেদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে ৫৮ (খ), ৫৮ (গ), ৫৮ (ঘ) ও ৫৮ (ঙ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, সংসদ ভেঙে গেলে বা মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। এই সরকারের মেয়াদ হবে অনধিক ৯০ দিন।

প্রধান উপদেষ্টা ও অনধিক ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। আর প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। যদি তিনি সম্মত না হন, তবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের মধ্য থেকে বয়সে জ্যেষ্ঠতম যিনি, তিনি হবেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনিও সম্মত না হলে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে বয়সে জ্যেষ্ঠতম জন প্রধান উপদেষ্টা হবেন।

যদি এই পদ্ধতিগুলো ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে অগ্রসর হবেন। প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক অনধিক ১০ জন উপদেষ্টাকে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করা হতো। যদি কোনো প্রক্রিয়াতেই প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সম্ভব না হতো, তবে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান ছিল।

আর উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতায় বলা ছিল, একজন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে তার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গসংগঠনের সদস্য হবেন না। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন না—মর্মে লিখিতভাবে সম্মত হতে হতো। আর প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টাদের বয়স ৭২ বছর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।

আর সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি ঘটবে। প্রধান উপদেষ্টা যদি রাষ্ট্রপতিকে জানাতেন যে কোনো উপদেষ্টা দায়িত্ব পালনে অক্ষম, তবে রাষ্ট্রপতি তাকে অপসারণ করতে পারবেন।

এফএইচ/এসএইচএইচ