আন্তর্জাতিক

‘শক্তি কমেছে’, তবুও যে কৌশলে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, ইরানের হাতে এখনো এমন সক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা সম্ভব।

শনিবার (১৪ মার্চ) হোয়াইট হাউজ এক বিবৃতিতে দাবি করে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের নৌবাহিনী যুদ্ধ অকার্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ও ইরানের আকাশসীমায় সম্পূর্ণ ও নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে, সেই অভিযানের নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, যা ব্যাপক ফলাফল দিচ্ছে।

রোববার (১৬ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও সোমবার বিকেলে কাতার জানায়, ইরান থেকে ছোড়া নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের একটি তারা প্রতিহত করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও সতর্কতা জারি করে। আবুধাবিতে একটি গাড়িতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে একজন নিহত হন।

এতে প্রশ্ন উঠেছে- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কি সত্যিই মারাত্মকভাবে কমে গেছে? আর যদি কমে যায়, তাহলে কীভাবে এখনো তারা প্রতিবেশী দেশ ও ইসরায়েলের দিকে হামলা চালাতে পারছে?

ইরান কি এখন কম ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছে?

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান উপসাগরীয় দেশ, ইসরায়েল ও অঞ্চলের অন্যান্য দেশের দিকে যে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র (ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ) ও ৫৪১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। অন্যদিকে, যুদ্ধের ১৫তম দিনে এসে তারা ছোড়ে মাত্র চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোন- আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে আল-জাজিরার একটি হিসাব অনুযায়ী।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও হামলা কমেছে। প্রথম দুই দিনে প্রায় ১০০টি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করা হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা এক অঙ্কে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ।

গত সপ্তাহে পেন্টাগন জানায়, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৯০ শতাংশ ও ড্রোন হামলা ৮৬ শতাংশ কমেছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার কত বড় ও কতটা ক্ষতিগ্রস্ত?

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের দপ্তর জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছেই সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে।

যদিও এ বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের কাছে প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর কমে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৫০০।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কৌশলের একটি বড় অংশ ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম বা লঞ্চার ধ্বংস করা। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণসহ নির্দিষ্ট সংকেত তৈরি হয়, যা স্যাটেলাইট ও রাডার ব্যবস্থায় ধরা পড়ে।

ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের উদ্ধৃত এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তার মতে, ইসরায়েল এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯০টি লঞ্চার অচল করে দিয়েছে, যেখানে মোট লঞ্চারের সংখ্যা ধরা হয় ৪১০ থেকে ৪৪০টির মধ্যে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস বলেন, ইরান একটি বিশাল দেশ হওয়ায় স্থলবাহিনী ছাড়া পুরোপুরি তাদের হামলার সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, লঞ্চার শনাক্ত করা সহজ নয়। আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেপণাস্ত্র এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, যা আগে সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত ছিল না বা গোপন স্থানে রাখা হয়েছিল।

তার মতে, ইরান এখন একসঙ্গে বড় আকারে হামলা চালানোর সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে তারা এখন এক বা দুটি ক্ষেপণাস্ত্র করে ছুড়ছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর দিকে, সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বদলে। যদিও ইরান দাবি করে, তারা কেবল অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে লক্ষ্য করছে।

ডেস রোচেস বলেন, সামরিকভাবে এটি খুব বড় কিছু নয়- এটি মূলত সতর্কতা ব্যবস্থা ক্লান্ত করা ও মানুষকে আতঙ্কিত করার জন্য ‘হ্যারাসমেন্ট ফায়ার’।

ইরানের কৌশল কী?

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের (এসডব্লিউবি) ভিজিটিং ফেলো ও ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেন, তেহরানের মূল হিসাব হচ্ছে- তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হওয়ার আগেই উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আগে ফুরিয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, এটি একটি ক্ষয়যুদ্ধ (ওয়ার অব অ্যাট্রিশন) হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহ থাকতে পারে, যেখানে প্রতিদিন কম সংখ্যক হলেও ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কিছু লঞ্চার ও বড় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করতে সফল হলেও ইরান তাদের কমান্ড ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করেছে এবং মোবাইল লঞ্চারের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে, যেগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন। এটি সময়ের বিরুদ্ধে একটি প্রতিযোগিতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতিযোগিতায় ইরান নিজেদের সম্ভাবনা দেখছে।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুম বলেন, আপনি কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতক্ষণ আপনি একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি বজায় রাখতে পারছেন। একটি সফল ড্রোনই নিরাপত্তার ধারণা ভেঙে দিতে পারে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন তৈরিতে অভিজ্ঞ। ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন সহজ কারখানায় দ্রুত ও বড় সংখ্যায় তৈরি করা যায় ও একসঙ্গে একাধিক ছোড়া সম্ভব, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে।

এই ড্রোনের গতি ঘণ্টায় মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার হওয়ায় হেলিকপ্টার দিয়ে তা ভূপাতিত করা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে।

সোমবারই (১৬ মার্চ) সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন হামলায় আগুন লাগে, ফলে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়। একইভাবে ফুজাইরাহ শিল্প এলাকায় আরেকটি ড্রোন হামলায় আগুন লাগে।

এছাড়া ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে সাইরেন বেজে ওঠে।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার আশঙ্কায় শত শত জাহাজ স্থবির হয়ে আছে, যদিও সরাসরি হামলার সংখ্যা কম। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি সামুদ্রিক ট্র্যাকার ২০টি জাহাজ-সংক্রান্ত ঘটনার তথ্য দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ইরানের ‘অসম যুদ্ধ’ কৌশলের অংশ, যেখানে সামরিকভাবে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দুর্বল পক্ষ হিসেবে তারা অপ্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হেনে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।

এরই মধ্যে তেহরান তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ঠেলে দিয়েছে ও বৈশ্বিক বাজারে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক কাতার এখনো তাদের উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি তাদের সরবরাহে ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করেছে এবং ইরাকের প্রধান দক্ষিণাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমে গেছে। ‘ফোর্স মাজ্যুর’ হলো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারলেও তাদের দায়ী করা যাবে না। কেননা, এই ঘটনা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলেন, যদি ইরান তেলের দাম বাড়িয়ে যেতে পারে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এমন ক্ষতি ডেকে আনতে পারে, যা ইরানে আমেরিকান বোমা হামলার ক্ষতির সমান বা তার চেয়েও বেশি।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ