একুশে বইমেলা

গডেস অভ অ্যামনেশিয়া: প্রেম-উপাখ্যান

মো. সালাউদ্দিন সৌখিন

কথাশিল্পী আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরের ‘গডেস অভ অ্যামনেশিয়া’ উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বার বার কেবল মনে পড়ছিল তাজমহলের পেছন দিয়ে বয়ে চলা যমুনার কথা। যে যমুনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে রাধা-কানাইয়ের প্রেম-উপাখ্যান। যে ধারাবতী যমুনার বিস্তর বর্ণনা; তাকে দেখতে গিয়েছিলাম অর্জুনা। চরে ঘুরতে ঘুরতে মনে হলো, এখানেই তো দেবী থাকেন, সারল্যপূর্ণ দেবী। যার মনে কোনো কৌটিল্য স্থান পায় না; ইচ্ছে হলেই ভুলে যেতে পারেন, যার অস্তিত্ব কল্পনা করা গেলেও কল্পনায় ধরা দেয় না। কেমন হতে পারে তার অপরূপ রূপ কিংবা আসন-বসন।

মানবজীবনের প্রধান যে চাহিদা–শান্তি; অবচেতন মনে, এক চাঁদনী রাতের আবহে লেখক সেই সূচনাই করেছেন। উপন্যাসের নামে গডেস বা দেবী প্রাধান্য পেলেও উপন্যাসজুড়ে প্রাধান্য পেয়েছে বর্ণনাকারী ও তার দাদি। দাদি যেন দেবীরই মনুষ্য রূপ, আবার মনে হয় তাহলে দাদি এবং দেবীর সাক্ষাৎ হয় কী করে! এ কী তবে নিজের সাথে নিজের পরিচয়! যে শান্তির পেছনে মানুষ ছুটে বেড়ায় যুগ থেকে যুগ, বেঁচে থাকে অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে–সেই শান্তি তো শুধু নিজেকে নিজের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে পারলেই পাওয়া যায়।

শান্তি খুঁজতেই আরও ছুটে বেড়িয়েছেন অতীতের খেরোখাতায়। নয়তো ২০২২ সালে বসে কেনইবা আশির দশকের স্মৃতিবর্ণন। অতীতের দিনগুলোতে শান্তি খোঁজার প্রয়াস ২০২৬ সালেও জীবন্ত যে কোনো মানুষই করে। অতীত তাদের কাছে শুধু অতীত নয়, সোনালি অতীত। দাদির চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, বর্তমানের চেয়ে অগ্রগামীতা। আশির দশকের অতি সাধারণ বৃদ্ধা কেমনভাবে যেন একুশ শতাব্দীর আধুনিক মত পোষণ করেন। রাজনীতি সচেতন দাদি চান দুই নেত্রী মিলিত হোক-দেশের তরে, শান্তির তরে। রাজনীতি এই দেশের মানুষের কাছে এমন এক উপজীব্য; যা চা খেতে খেতে আড্ডাতে তুলতেই হয়।

আরও পড়ুনপদ্মা নদীর মাঝি: জীবন সংগ্রামের নির্মোহ দলিল 

ঔপন্যাসিককে কবি হিসেবে প্রথম জানাশোনা। তাই হয়তো অনেকটা অংশজুড়ে গদ্যে লিখিত কবিতার মতো মনে হয়েছে। এ আমার নিছক দুর্বলতা হতে পারে। ছোট ছোট চরিত্রও উপকরণ জুগিয়েছে নিখুঁত বুননের; পোস্টমাস্টার, নতুন মেয়েটা ইত্যাদি। উপন্যাসের আরেকটি চমৎকার দিক হলো, বর্ণনাকারী নিজেই তার জন্মের আগের ঘটনা থেকে শুরু করে তার জন্ম, বেড়ে ওঠা বর্ণনা করেন। অর্থাৎ লেখক এখানে সর্বজ্ঞাতা বর্ণনাকারীর ভূমিকা পালন করেন।

কৈশোর-প্রেমের একটি ছোট্ট শাখা বর্ণনাকারীর হৃদয়ে গেঁথে আছে। ওই কাণ্ড ভুল নাকি সঠিক; সে প্রশ্ন করার আগেই আধুনিক যুগের স্বার্থপর আচরণ ফুটে ওঠে। এ ছাড়া সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা, গান, সিনেমা ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রিয় জারুল গাছের সাথে সম্পর্কিত ঘটনার প্রেক্ষিতে জারুল গাছ এখন একটি রূপক। এই জারুল গাছের অস্তিত্ব আমার জীবনেও আছে। সবার জীবনেই হয়তো কমবেশি কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা আছে; তারই প্রতীক এই জারুল গাছ।

জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করা যায় লেখকেরই ভাষ্যে, ‌‘একেকটা রাস্তার একেক রকম ঘ্রাণ থাকে, চাইলেই সব ঘ্রাণ ভুলে যাওয়া যায় না।’ আশির দশক থেকে ২০১৮ সালের যাত্রা হয়তো অতীত ছাড়া মনে রাখার মতো কিছু নয়। তবে ‘ভুলে যাবার মতোন বড় শক্তি পৃথিবীতে কমই আছে’। তাই ফুরসত পেলে যারা বই পড়েন, শান্তির ছোঁয়া পেতে; তারা ছুটির সময়ে ডুব দিয়ে এই ভুলে যাবার উপন্যাসে নিজেকে ভোলাতে পারেন।

এসইউ