দেশের ক্রিকেটে হঠাৎই একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটার সম্ভাবনা জেগেছে। শুধু ক্রিকেটাঙ্গন বললে হয়তো কম বলা হবে, আসলে ক্রীড়াঙ্গনেই হঠাৎ একটি উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং সে উত্তেজনার সূচনা হয়েছে দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক সংস্থা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠিত এক তদন্ত কমিটির বিপক্ষে বিসিবির সরাসরি অবস্থান নেওয়ায়।
সবার জানা, বিসিবি নির্বাচনে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম ও সরকারি হস্তক্ষেপ ছিল কি না- তা খুঁটিয়ে দেখতেই একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সেটাও এনএসসি নিজে থেকে করেনি। বিসিবি নির্বাচনের আগে থেকেই যে পক্ষ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলে আসছিল, যারা জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার বিতর্কিত কাউন্সিলরশিপ বাতিলের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই বলে নির্বাচন বয়কট করেছিলেন- ঢাকার সেই ৫০ ক্লাব ও জেলা-বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলরশিপে বৈষম্যের শিকার হয়ে যারা কাউন্সিলর হতে পারেননি, তারা সবাই একজোট হয়ে পুরো বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অস্বচ্ছ, নিয়মবহির্ভূত এবং সরকারের- বিশেষ করে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া ও বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অযাচিত ও অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে একটি চিঠি দিয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে।
সেই চিঠির ভিত্তিতেই এনএসসি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পুরো বিসিবি নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল, তা জানতেই মূলত এ উদ্যোগ এবং ওই তদন্ত কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, তদন্ত কমিটির কাজ পাঁচ-ছয় দিন আগেই শুরু হয়ে গেছে।
ঠিক এ অবস্থায় বিসিবি থেকে গত পরশু একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের বাইরে থাকা বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল অস্ট্রেলিয়ায় বসেই বিসিবির প্যাডে ওই প্রেস রিলিজ দিয়েছেন। আরও জানা গেছে, দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক সংস্থা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ওই তদন্ত কমিটিকে ‘চ্যালেঞ্জ’ করে বিবৃতি দেওয়ার বিষয়টি বোর্ডে কোনো আলোচনা ছাড়াই করা হয়েছে। বিসিবির শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত পাঁচজন পরিচালক নিশ্চিত করেছেন, তারা কেউই ওই প্রেস রিলিজ সম্পর্কে কিছু জানতেন না।
এমনকি বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যানও কিছু জানতেন না। বর্তমানে পবিত্র মক্কায় ওমরাহ পালনরত বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন জাগো নিউজকে মুঠোফোনে জানিয়েছেন, ‘আমি তো ওমরাহ করতে মদিনা থেকে মক্কায় এসেছি। আমি এসবের কিছুই জানি না।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিসিবির ব্যানারে আমিনুল ইসলাম বুলবুল নিজেই এ বিবৃতি তৈরি করে বোর্ডে পাঠিয়ে তা মিডিয়ায় প্রকাশের নির্দেশ দেন। যা বিসিবির নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান নির্দেশ করে।
বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না। একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিসিবি ও এনএসসির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়ম মেনে এবং আইনকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করেই গত অক্টোবরে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবং নির্বাচিত কমিটি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তদন্ত কমিটি গঠনে বিসিবি উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, এটি বিসিবির স্বাধীনতা খর্ব করেছে এবং বোর্ডের স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে। বিসিবি আরও আশঙ্কা করছে, সরকারের এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের চোখে ‘বাহ্যিক হস্তক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা বাংলাদেশের সদস্যপদ বা ক্রিকেটের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এখন প্রশ্ন, কী হবে পরবর্তী পরিস্থিতি? বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের এ বিবৃতি বোর্ডের অনেকেই সমর্থন করছেন না। কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে, আবার কেউ সরাসরি বলেছেন- এমন বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। সেই তালিকায় বিসিবির সিনিয়র সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ এবং ইফতেখার রহমান মিঠুর মতো পরিচালকও আছেন।
একটি বোর্ডের কোনো পরিচালক জানেন না, অথচ সভাপতি বিদেশে বসে একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে বিবৃতি দিয়ে দেন- এ বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত সংগঠক ও সাবেক বিসিবি পরিচালক সিরাজউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত, বিসিবির ব্যানারে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, তা সব পরিচালকের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি। এটি বোর্ড প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুলের একক সিদ্ধান্ত। তাই এটি আসলে বিসিবির বিবৃতি নয়। তবে ব্যানার যেহেতু বিসিবির, সবাই এটিকে বিসিবির বিবৃতি হিসেবেই নেবে।’
তিনি আরও দাবি করেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি পার্শ্ববর্তী একটি দেশের একজনকে দিয়ে এ ড্রাফট করানো হয়েছে। পুরো বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের বিবৃতি দেওয়া বিসিবির গঠনতন্ত্রবিরোধী এবং আইনের লঙ্ঘন।’
সিরাজউদ্দীন আলমগীর বলেন, বিসিবি ও এনএসসির গঠনতন্ত্র ভালোভাবে দেখা উচিত ছিল বোর্ড সভাপতির। তিনি চাইলে সরাসরি বিবৃতি না দিয়ে এনএসসিকে চিঠি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারতেন; কিন্তু তা না করে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে তদন্ত কমিটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কর্মকাণ্ডে দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের কোনো ইতিবাচক দিক দেখা যাচ্ছে না। বরং তার কার্যক্রম দেশের ক্রিকেটের স্বার্থের পরিপন্থী। শেষে তিনি বলেন, বিসিবি সভাপতির এ পদক্ষেপ শুধু গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনই নয়, বরং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল।
তার প্রশ্ন, তিনি কি সত্যিই দেশের ক্রিকেটের মঙ্গল চান, নাকি ব্যক্তিগত অবস্থান ধরে রাখাই তার মূল লক্ষ্য? এই প্রশ্ন এখন শুধু সিরাজউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীরের নয়, দেশের সব ক্রিকেটপ্রেমীর।
এআরবি/আইএইচএস/