রাস্তার দুই পাশে সবুজ গাছের ছায়া। দৃষ্টিনন্দন সড়কে শা শা করে চলে গাড়ি। প্রশস্ত ফুটপাত, চারপাশে অসংখ্য বসার জায়গা। সন্ধ্যা নামলেই কৃত্রিম আলোর ঝলকানি। নিরিবিলি বসে গল্প-আড্ডায় মেতে ওঠার মতোই জায়গা হাতিরঝিল। নগরজীবনের ক্লান্তি কাটাতে হাতিরঝিলে আসা দর্শনার্থীদের ‘অশান্তি’ এখন দুর্গন্ধ। পথচারী-দর্শনার্থী কিংবা স্থানীয় বাসিন্দা; সবার ভাষ্য—‘হাতিরঝিলে সব ভালো; কিন্তু চলতে-ফিরতে হয় নাক চেপে। এক-দুবার শ্বাস নেওয়াটাও এখন কষ্ট।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাতিরঝিলে প্রায় ৭০০ নর্দমার ময়লা-আবর্জনা ও নোংরা পানি এসে পড়ে। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার যথাযথ উদ্যোগ নেই। আবর্জনা পচে পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে। পানি শোধনে বরাদ্দ থাকলেও ঠিকমতো কাজ হয় না। ফলে দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল হয়ে উঠছে পচা পানির বিষাক্ত জলাশয়।
৩০২ একর আয়তনের হাতিরঝিল এফডিসি থেকে গুলশান পর্যন্ত সংযুক্ত। ২০১৩ সালে জনসাধারণের জন্য এ ঝিল উন্মুক্ত করা হয়। তখন এর পানি বেশ পরিষ্কার ছিল। কিন্তু পরিশোধনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় পানির গুণগত মান খারাপ হতে হতে প্রকট আকার ধারণ করেছে। পয়োবর্জ্য, ময়লা-আবর্জনা ও ড্রেনের পানি ঢুকে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে ঝিলের পানি। বাতাসে ভাসছে উৎকট গন্ধ।
গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি হাতিরঝিল ঘুরে দেখা যায়, ঝিলের প্রায় সব অংশ থেকেই পানির দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। পানিতে নানা বর্জ্য-পলিথিন-প্লাস্টিকের পাইপও ভাসতে দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা গুদারাঘাট হয়ে পুলিশ প্লাজা যাওয়ার অংশে। এছাড়া কারওয়ান বাজারের প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের দিকটাতেও বর্জ্যের ছড়াছড়ি। বিষাক্ত পানিতে মৃত মাছও ভাসতে দেখা যায়। পানির ওপরে বর্জ্যের একটি পুরু স্তর তৈরি হয়েছে।
মহানগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রাজিবুর রহমান। বৃহস্পতিবার বিকেলে লেকপাড়ে কথা হয় তার সঙ্গে। রাজিবুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এ এলাকায় ১৪ বছর বসবাস করছি। হাতিরঝিল যখন প্রথম খুলে দেওয়া হয়, তখন রোজ সকালে স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে হাঁটতে বের হতাম। এখন সকালে হাঁটা তো দূরের কথা, খুব প্রয়োজন ছাড়া এখন এপাশ দিয়ে চলাফেরাই করি না। প্রকট দুর্গন্ধ। আগের মতো সেই নির্মল পরিবেশ আর নেই।’
খোলা আকাশের নিচে সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করবেন। সেজন্য বাড্ডা হাইস্কুলের দশম শ্রেণির একদল শিক্ষার্থী এসেছে হাতিরঝিলে। কিন্তু কোন পাশে দুর্গন্ধ নেই, তা খুঁজতে হয়রান তারা। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তাদের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের।
আরও পড়ুনহাতিরঝিলের চক্রাকার বাসেও ‘র্যাপিড পাস’ চালু‘অরক্ষিত’ হাতিরঝিল, সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কপান্থকুঞ্জ ও হাতিরঝিল অংশে নির্মাণকাজে স্থিতাবস্থা আপাতত বহাল
শিক্ষার্থীদের দলের একজন নাবিল আকরাম। তার ভাষ্য, গুদারাঘাট-বাড্ডার পাশটাতে বসার উপায়ই নেই। বনশ্রীর দিকটাতে এলাম। এখানেও প্রকট দুর্গন্ধ। ব্রিজের ওপর বসলেও গন্ধ আসছে। আমরা শুধু ঘুরছি। কোথায় বসবো বুঝতে পারছি না।
মধ্যবাড্ডার তিতাস গলির স্থায়ী বাসিন্দা রেবেকা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আগে বিকেলে বাচ্চাদের খেলতে নিয়ে যেতাম হাতিরঝিল পাড়ের দিকটাতে। পচা দুর্গন্ধে বাচ্চারা এখন ওদিকে আর যেতেই চায় না, আমরাও যাই না। গেলেও নাক-মুখ ঢেকে যাই, শ্বাস বন্ধ করে ঘুরে আসি। আমরা স্থায়ী বাসিন্দা। যদি ভাড়া বাসায় থাকতাম, তাহলে এলাকা ছেড়ে দিতাম।’
পুলিশ প্লাজার পাশে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আগে কাস্টমার বেশি পাইতাম। দিনে ১০০০-১২০০ টাকা বিক্রি হতো। পানিতে গন্ধ বাড়ছে; গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে কে খায় বলেন? তার ওপর রাস্তা কাটাকাটি করছে। পরিবেশটাও খুব খারাপ, সন্ধ্যার পর চুরি-ছিনতাইও হয়। লোকজন কম আসে। বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বসি; কিন্তু ৫০০ টাকার বিক্রিও হয় না।’
বিপর্যস্ত হাতিরঝিল জীববৈচিত্র্যের হুমকিবিভিন্ন সময় গবেষণায় হাতিরঝিলের পানি ভয়ংকর দূষিত হয়ে ওঠার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২২ সালে হাতিরঝিল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের সংগৃহীত নমুনায় ক্ষতিকর রাসায়নিক পিএফওএ (পারফ্লুরোঅকটানোয়িক অ্যাসিড) এবং পিএফওএস (পারফ্লুরোঅকটেনসালফোনিক অ্যাসিড) উভয়ই ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি বিষাক্ততার জন্য দায়ী। পিএফওএসের স্তর পরামর্শমূলক স্তরের চেয়ে ১৮৫ গুণ বেশি মাত্রায় পাওয়া যায়। এমন পরিস্থিতিতে হাতিরঝিলের পানি জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি, বলছেন পরিবেশবিদরা।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (সিএপিএস) প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক। আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, বর্জ্য দূষণে হাতিরঝিলের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, যা শহরের প্রতিবেশ ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ঝিলে নেই আগের মতো ব্যাঙ, সাপ। বিলীন হয়ে যাচ্ছে উপকারী ক্ষুদ্র পোকামাকড়ও, যা নগরের মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দায়ী কে, কী করছে কর্তৃপক্ষহাতিরঝিলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, চারপাশের ৬৮০টির বেশি নর্দমার পানি হাতিরঝিলের পানিতে মিশে যায়। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানুষ আবর্জনা, পলিথিন এমনকি শিল্পবর্জ্য ফেলছে ঝিলের পানিতে। ফলে পানি দূষিত হচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা পচে মিথেন গ্যাস সৃষ্টি হচ্ছে, আর সে কারণেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুনপান্থকুঞ্জ-হাতিরঝিল ধ্বংস করে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ বাতিলের দাবিছুটির দিনেও ফাঁকা হাতিরঝিলবড় বড় গর্তে গতি হারাচ্ছে হাতিরঝিল সড়কআগের মতো দর্শনার্থী আসে না হাতিরঝিলে
রাজউকের দাবি, জলাশয়ের পানি দুর্গন্ধমুক্ত রাখতে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ থাকলেও দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কারণে সেটি দৃশ্যমান নয়। ঝিলের পানি পরিষ্কার রাখতে দুই বছরের (২০২৪-২০২৫) জন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
রাজউকের প্রকৌশলী সাব্বির বিন তাহের। তিনি হাতিরঝিল প্রকল্পের নির্বাহী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক)। সাব্বির বিন তাহের বলেন, হাতিরঝিলের চারপাশে যেসব নর্দমা গর্ত রয়েছে প্রতি ছয় মাসে একবার সেগুলো পরিষ্কার করা হয়। কঠিন বর্জ্য গর্তের পেছনে জমা হয় এবং তারপরে লেকের পানিতে ভেসে যায়। রামপুরা এবং কাঁঠালবাগানে দুটি স্লুইস গেট রয়েছে। বর্ষাকালে এগুলো খুলতে হয়, তখন কঠিন বর্জ্য প্রবেশ করে।
রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি বছর রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দের বড় অংশই বিদ্যুৎ খাতে যায়। পানি পরিশোধনের জন্য বরাদ্দ রাসায়নিক প্রায় এক বছর আগে শেষ হয়ে যায়। ২০২১ সালের আগের অবশিষ্ট রাসায়নিক এখন অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেটি বছরে মাত্র একবার, যা যথেষ্ট নয়।
এএএইচ/এমআইএইচএস/এমএমএআর