খেলাধুলা

এক সময় ক্রিকেটই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম: তাওহিদ হৃদয়

তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বগুড়া শহরের মালতিনগরে; কিন্তু তাওহিদ হৃদয় সেই ছোটবেলা থেকেই ঈদ করেন দাদার বাড়িতে। সেটাও খুব দূরে নয়- বগুড়া শহর থেকে ২০-২২ কিলোমিটার দূরে; গ্রামের নাম দক্ষিণপাড়া। জন্মের আগে দাদাকে হারানো তাওহিদ হৃদয়ের দাদির বিয়োগ ঘটে তার ছোটবেলাতেই।

তারপরও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় থাকায় প্রতি ঈদেই ছুটে যান দাদাবাড়ি। এবারও সেই দক্ষিণপাড়া গ্রামেই ঈদের নামাজ পড়েছেন বর্তমানে সাদা বলের জাতীয় দলের নির্ভরযোগ্য এই মিডল অর্ডার। ঈদের ঠিক আগের দিন দুপুরে (২০ মার্চ, শুক্রবার) যখন জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন, তখন বগুড়া শহর থেকে ঈদ করতে দক্ষিণপাড়ার দাদাবাড়িতে পৌঁছান তিনি।

জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে তার ছোটবেলার ঈদের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন তাওহিদ হৃদয়। শৈশব ও কৈশোরে ঈদের দিনটি কেমন কাটত- ক্রিকেট নিয়ে ব্যাট-বল হাতে মেতে থাকা, সারাদিন গ্রামের মাঠে সমবয়সীদের নিয়ে ক্রিকেট খেলে কাটানো সেই গল্পের পাশাপাশি শুনিয়েছেন ক্রিকেটার হওয়ার কাহিনীও।

সে গল্পেও আছে বিষাদের গন্ধ। দুঃখ, কষ্ট আর যন্ত্রণায় ভরা কঠিন দিন-রাতের অজানা কাহিনী উঠে এসেছে জাতীয় দলের এই নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটারের মুখে।

আসুন, তার মুখ থেকেই শোনা যাক সেই গল্প-

‘আমার সব কিছুই বগুড়ায়। বগুড়া শহরের মালতিনগরেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তবে সাধারণত ঈদ-উৎসবের সময় আমরা সবাই চলে যেতাম দাদার বাড়িতে, গ্রামে। ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের কাছাকাছি সেই গ্রাম। এবারও আমি এসেছি ঈদ করতে। ঈদের নামাজ পড়ে, সেমাই খেয়ে আবার চলে যাব বগুড়া শহরে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের ঈদের প্রথম প্রহরটা দাদাবাড়িতেই কাটে। সেটা এখনো বহাল আছে। খেলা না থাকলে, বিদেশে না গেলে, ঈদের সময় দেশে থাকলে অবশ্যই গ্রামে চলে যাই। দাদাকে আমি দেখিনি, দাদিকেও ছোটবেলায় হারিয়েছি। কিন্তু দাদাবাড়িতে ঈদ করা আর গ্রামের খোলা মাঠে অনেক মানুষের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তেই আমার বেশি ভালো লাগে। এবারও তাই এসেছি।’

ওই সময়ের কোনো স্মৃতি আপনার মনে দাগ কেটে আছে কি? জামা-কাপড়, ঈদের সালামি নিয়ে কোনো স্মরণীয় ঘটনা?

‘না, সে অর্থে তেমন কিছু নেই। ঈদের সালামি নিয়ে আমার কখনো তেমন আগ্রহ ছিল না। আমি যখন ঈদে গ্রামে আসতাম, তখনই একদল ছেলে জড়ো হতো। কারণ একটাই- তাদের নিয়ে আমি ক্রিকেট খেলতাম। ক্রিকেট খেলাই ছিল তখন আমার প্রধান আকর্ষণ। ঈদের নামাজ পড়েই আমরা ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে নেমে পড়তাম। এখন তো অ্যান্ড্রয়েড ফোনের যুগ- এসব খুব মিস করি। আগে আমাদের কোনো ফোনই ছিল না। সময় কাটত ক্রিকেট খেলে আর গল্প করে। এখন আর হয় না, সেই সময়ের কথা খুব মনে পড়ে।’

ছোটবেলা থেকেই কি ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ছিল?

‘আমি জানি না। শুনেছি আল্লাহ সব আগে থেকেই লিখে রাখেন। বাকিটা আমাদের কাজের ওপর নির্ভর করে। ছোট থেকেই আমি ক্রিকেট খেলতাম খুব বেশি। অনেক বল হারিয়েছি- এত বল কিনেও শেষ করা যেত না। বলতে পারেন ক্রিকেট ছিল এক ধরনের নেশা।’

তাহলে ব্যাট-বলের জন্য আবদার করতেন?

‘না, আমি জানতাম ব্যাট-বল পাওয়া যাবে। ব্যাট সব সময় হাতেই থাকত। বল না থাকলে জাম্বুরা গাছ থেকে ফল পেড়ে সেটাকেই বল বানিয়ে খেলেছি।’

ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছে কবে থেকে জোরালো হলো?

‘একদিন এলাকায় খেলতে খেলতে এক বন্ধুকে বললাম, বড় মাঠে খেলতে চাই। তখন এক বড় ভাই আমাকে বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে নিয়ে যান। মাঠ দেখে দারুণ ভালো লাগল। তখন থেকেই স্বপ্নটা তৈরি হয়।’

এরপর শুরু হয় তাওহিদ হৃদয়ের ক্রিকেটার হওয়ার পথচলা। বয়সভিত্তিক দলে খেলতে শুরু করেন- অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬, পরে অনূর্ধ্ব-১৮; কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৭ দলে সুযোগ না পাওয়ার ঘটনা তার জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

‘আমি তখন জেএসসি পরীক্ষার্থী। ভারত সফরের জন্য ভেবেছিলাম দলে থাকব। সেই বিশ্বাসে পরিবারকে বলেছিলাম পরীক্ষা দেব না। কিন্তু দল ঘোষণার পর দেখি আমি দলে নেই- স্ট্যান্ডবাই। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। বাসে করে ফেরার সময় পুরো পথ কেঁদেছি। কয়েক মাস বাবার সঙ্গে কথাও বলিনি।’

এই আঘাতে এক সময় ক্রিকেট ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি, ‘৬-৭ মাস খেলার বাইরে ছিলাম। এ সময় ভেবেছিলাম ক্রিকেটই ছেড়ে দেবো। পরে মহিউদ্দিন স্যার আমাকে আবার ফিরিয়ে আনেন। তিনি আমাকে বিনা খরচে সুযোগ দেন এবং বলেন এক বছর মন দিয়ে চেষ্টা করতে। সেই বছর আমি সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি।’

সেখান থেকেই তার নতুন পথচলা শুরু। পরে শাইনপুকুর ক্লাবে খেলার সুযোগ পান এবং ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পান।

বিদেশে ঈদ করার অভিজ্ঞতা?

‘হ্যাঁ, অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে প্রথম বিদেশে ঈদ করি ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে। পরে ২০২৪ সালে জাতীয় দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজেও ঈদ করেছি।’

এখনকার ঈদ আর ছোটবেলার ঈদের পার্থক্য?

‘পার্থক্য বয়সের। ছোটবেলায় যা করতাম, এখন আর সম্ভব নয়। তবে এখনো ঈদের দিন মাঠে খেলা হলে দেখতে যাই। আর চেষ্টা করি গ্রামে গিয়ে নামাজ পড়তে। এবারও এসেছি, নামাজ পড়ে আবার শহরে ফিরে যাব।’

এআরবি/আইএইচএস