ধর্ম

ব্যবসার বরকত নষ্ট করে যে ৮ কাজ

ইসলামি শরিয়তে জীবিকা অন্বেষণের অন্যতম পবিত্র মাধ্যম হলো ব্যবসা। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে পরিচালিত ব্যবসায় মহান আল্লাহ তাআলা বরকত দান করেন। সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ীকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে বিশেষ মর্যাদা দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে। (সুনানে তিরমিজি: ১২০৯)

আর ব্যবসা যদি শরিয়ত নির্দেশিত পথে পরিচালিত না হয়, সততা ও আমানতদারিতার সঙ্গে পরিচালিত না হয়, তাহলে ব্যবসার বরকত নষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও আখেরাতের শাস্তি তো আছেই। এখানে আমরা এমন কিছু কাজের কথা উল্লেখ করছি যা সাময়িকভাবে লাভজনক মনে হলেও ব্যবসার বরকত কেড়ে নেয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়।

১. মাপে কম দেওয়া

শহর কিংবা গ্রাম—সবখানেই মাপে কম দেওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। অথচ পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সুরা মুতাফফিফিনে আল্লাহ তাআলা বলেন, বহু দুর্ভোগ আছে তাদের, যারা মাপে কম দেয়, যারা মানুষের কাছ থেকে যখন মেপে নেয় পূর্ণমাত্রায় নেয় আর যখন অন্যকে মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কমিয়ে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না, তাদেরকে জীবিত করে ওঠানো হবে? এক মহাদিবসে, যেদিন সমস্ত মানুষ রাব্বুল আলামিনের সামনে দাঁড়াবে। সুরা মুতাফফিফিন: ১-৬)

২. পণ্যের মান নিয়ে প্রতারণা

অনেক সময় ক্রেতার অগোচরে ভালো পণ্যের ভেতরে নিম্নমানের পণ্য মিশিয়ে দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৫২)

৩. মিথ্যা শপথ করা

পণ্যের গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বা ক্রেতার আস্থা অর্জনে মিথ্যা শপথ করা একটি বড় গুনাহ। হাদিস অনুযায়ী, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাকে পবিত্র করবেন না, যে মিথ্যা শপথের মাধ্যমে পণ্য চালিয়ে দেয়। (সুনানে নাসাঈ: ৫৩৩৩)

৪. ত্রুটি গোপন করে পণ্য বিক্রি

পণ্যের কোনো দোষ থাকলে তা ক্রেতাকে স্পষ্ট করে জানানো বিক্রেতার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। নিজের মুসলিম ভাইয়ের কাছে পণ্যের ত্রুটি গোপন করে কিছু বিক্রি করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই। অতএব কোনো মুসলমানের পক্ষে তার ভাইয়ের কাছে পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা না করে তা বিক্রি করা বৈধ নয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪৬)

৫. ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা

ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনে অনেকে ঋণ গ্রহণ করেন। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারের অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করেন। ইসলামে এ ধরনের কাজকে 'জুলুম' হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম। (সহিহ বুখারি: ২২৮৭)

৬. সুদি লেনদেন করা

সুদ ব্যবসার বরকত নির্মূল করে দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোনো অতি কুফরকারী পাপীকে ভালোবাসেন না। (সুরা বাকারা: ২৭৬)

৭. অবৈধ মজুদদারি করা

অধিক মুনাফার আশায় পণ্য আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের বিরুদ্ধে খাদ্যদ্রব্য মজুদদারি করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ ও দারিদ্র্যের কশাঘাতে শাস্তি দেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২১৫৫)

৮. দালালি ও অনৈতিক প্রতিযোগিতা

অন্যের ঠিক হওয়া কেনাবেচা নষ্ট করা বা দালালি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। (সহিহ বুখারি: ২১৪০) আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা ক্রেতাকে ঠকানোর জন্য দ্রব্যের দরদাম কোরো না। (সুনানে তিরমিজি: ১৩০৪)

আমাদের প্রত্যেকের রিজিক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। অনৈতিক পথ অবলম্বন করে আমরা নির্ধারিত রিজিকের চেয়ে এক বিন্দু বেশি অর্জন করতে পারব না, বরং বরকত হারাব এবং আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাই ইহকাল ও পরকালের সাফল্যের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে ইসলামের বিধান মেনে চলুন।

ওএফএফ