আহমাদ সাব্বির
২৬ মার্চ—এই তারিখটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মত্যাগ এবং আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে শুরু হয়েছিল এক অবিস্মরণীয় সংগ্রাম—স্বাধীনতার সংগ্রাম। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়, জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই অর্জন কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; এটি মানুষের মুক্তি, মর্যাদা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
এই স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, অশ্রু এবং আত্মোৎসর্গ। বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে লড়েছেন, কারণ তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে ছিল আত্মমর্যাদা, নিজের মত করে বাঁচার অধিকার। তাদের এই ত্যাগের ফলে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন দেশের জন্ম হয়।
স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক বিষয় নয়; এর একটি গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিকও রয়েছে, যা ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। আল্লাহ তাআলা কাউকে পরাধীন করে সৃষ্টি করেননি; বরং প্রত্যেক মানুষকে দিয়েছেন বিবেক, চিন্তা এবং বিশ্বাসের স্বাধীনতা। কোরআনের ভাষায়, মানুষকে জোর করে ইমান গ্রহণ করানো যায় না—এটি হতে হবে তার নিজের উপলব্ধি ও ইচ্ছার ফল। আল্লাহ বলছেন, তোমার প্রতিপালক চাইলে দুনিয়ার সকল মানুষ একত্রে ইমান গ্রহণ করতো। তুমি কি তাদেরকে মুমিন বানাতে বল প্রয়োগ করবে? (সূরা ইউনুস: ৯৯)।
ইসলামের স্বাধীনতার এই ধারণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলাম মানুষকে স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু সেই স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। এটি দায়িত্ববোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ তার চিন্তা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে স্বাধীন, কিন্তু আল্লাহর কাছে বিশ্বাসের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
ইসলামের মূল বাণী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’—এই কালিমাই এক মহিমান্বিত স্বাধীনতার ঘোষণা। এর মাধ্যমে একজন মানুষ ঘোষণা করে যে, সে আর কোনো মানুষের, কোনো মতাদর্শের বা কোনো ক্ষমতার দাস নয়; সে কেবলমাত্র আল্লাহরই বান্দা। এই ঘোষণা মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় দাসত্ব, সামাজিক শোষণ এবং মানসিক পরাধীনতা থেকে মুক্ত করে।
ইতিহাসে দেখা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) স্বাধীনতার এই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তিনি এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে দাসদের মুক্তি দেওয়া হতো, তাদের সম্মান দেওয়া হতো এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও নিয়োজিত করা হতো। হজরত বেলালের (রা.) মত একজন প্রাক্তন দাসকে নবীজির (সা.) মসজিদের মুয়াজ্জিন করা ছিল সেই সাম্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে তার তাকওয়া ও চরিত্র দিয়ে, বর্ণ বা অবস্থান দিয়ে নয়।
বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইসলাম সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। ইসলাম ঘোষণা করেছে—কোনো আরবের ওপর অনারবের, বা কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এই বাণী মানবজাতিকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী।
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা মানে কেবল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সমাজে কেউ যেন অন্যের অধিকার হরণ না করে, কেউ যেন অন্যকে শোষণ না করে—এটিও স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাই ইসলাম এমন কোনো স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় না, যা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়।
ইতিহাসে ইসলাম শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছে। ভারত উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ঘটেছিল এমন এক সময়ে, যখন সমাজ ছিল চরম বর্ণবৈষম্য ও শোষণের শিকার। ইসলাম সেই নিপীড়িত মানুষের জন্য নিয়ে আসে মুক্তির বার্তা। মানুষ আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেদের মানবিক মর্যাদা ফিরে পায়।
নবী-রাসূলদের জীবনেও আমরা দেখি স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের এক ধারাবাহিক ইতিহাস। তারা সবসময় জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন। মহানবীর (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত এবং পরবর্তীতে মক্কা বিজয়—এ সবই স্বাধীনতার সংগ্রামের উজ্জ্বল উদাহরণ।
মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাও ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.) নিজ মাতৃভূমি মক্কাকে ভালোবাসতেন, এবং মদিনাকে নিজের আবাসভূমি হিসেবে গ্রহণ করে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। দেশের স্বাধীনতা রক্ষাকে তিনি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন যে, এক রাত পাহারা দেওয়াকে মাসব্যাপী ইবাদতের চেয়েও উত্তম বলেছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা এই দৃষ্টিকোণ থেকে সত্যিই অনন্য। তারা শুধু একটি ভূখণ্ডের জন্য নয়, মানুষের অধিকার, সম্মান এবং স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন। যারা এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। ইসলামের ভাষায়, নিজের অধিকার রক্ষার জন্য জীবনদানকারী শহীদের মর্যাদা লাভ করে—এটি তাদের আত্মত্যাগকে আরও মহিমান্বিত করে।
ইসলাম কখনো অরাজকতা বা সহিংসতাকে সমর্থন করে না, কিন্তু অন্যায়, অত্যাচার এবং দাসত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে সমর্থন করে। যখন মানুষের স্বাধীনতা হরণ করা হয়, তখন সেই স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করা ন্যায়সঙ্গত। কোরআন এই সংগ্রামকে বৈধতা দিয়েছে এবং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
ওএফএফ