আন্তর্জাতিক

যেসব কারণে ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো ভেঙে পড়েনি

যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস হতে চললো ও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসজ শীর্ষ নেতাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে একের পর এক শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো ভেঙে পড়েনি।

খোদ ইরানের ভেতরেই অনেকে আশা করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর। কিন্তু তা হয়নি। বরং ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট আছে।

এর কারণ হিসেবে প্রথমেই কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করা যেতে পারে - যেমন শাসন কাঠামো ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর দেশটির নেতৃত্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

সেই সঙ্গে ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে ইরানে হামলা শুরুর আগে দেশটিতে চলা সরকার বিরোধী বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে তেহরান। ফলে, পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত স্থিতাবস্থায় রয়েছে।

প্রথাগত বাহিনীগুলো সক্রিয়

ইরানের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। যদিও সর্বোচ্চ নেতা এখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, তবে এর পাশাপাশি একটি ‘সমান্তরাল রাষ্ট্র’ কাঠামো বিদ্যমান এখানে, সেটি হলো- আইআরজিসি।

আইআরজিসি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার ক্ষমতা কেবল প্রথাগত সামরিক ম্যান্ডেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

চলমান এ যুদ্ধে এবং গত বছরের জুনে ১২ দিনে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের সময় আইআরজিসির বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। কিন্তু আইআরজিসি বারবারই বলে আসছে যে, তাদের কেউ নিহত হলে সেই পদে স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য অন্য আরেকজন সবসময় প্রস্তুত থাকেন।

এছাড়া আইআরজিসি আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’কে নিয়ন্ত্রণ করে, যা প্রায় ১০ লাখ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া বাহিনী। ভিন্নমত দমনে রাজপথে শক্তি প্রয়োগের জন্য প্রায়ই এ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

ইসরায়েল জানিয়েছে যে, তারা বাসিজের কিছু চেকপোস্ট লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু তাতে আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের নিয়ন্ত্রণ খর্ব হয়নি।

চলতি সপ্তাহে তেহরান থেকে পাওয়া খবরে জানা যাচ্ছে, বাসিজ বাহিনী এখনও বিভিন্ন শহরে বেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, এমনকি তারা সড়কে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশির কাজ করছে নিয়মিতভাবে।

নিয়ন্ত্রণে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ, নেই ইন্টারনেট

এছাড়া বছরের শুরুতে যে টানা সরকার বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ইরানের বিভিন্ন শহর, সেটি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একেবারে স্থিমিত হয়ে পড়েছে। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে মানুষের মনে, একইসঙ্গে, কর্তৃপক্ষও মানুষজনকে বাইরে বের হতে নিরুৎসাহিত করছে।

কর্তৃপক্ষ দেশের ভেতরের মানুষকে সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও বিবৃতি এবং মোবাইল ফোনে গণ-এসএমএস পাঠিয়ে রাজপথে আন্দোলনে না নামার জন্য সতর্ক করে আসছে।

একই সাথে নেই ইন্টারনেট। দেশটির বহু মানুষ ২৫ মার্চকে ইন্টারনেট বিহীন ৬০০তম ঘণ্টা হিসেবে পালন করছেন। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছেঅ।

সেইসঙ্গে সরকারি নজরদারি ও নানা জরিমানার ভীতি থাকায় বিক্ষোভকারীদের নিজেদের মধ্যে আন্দোলন সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে বড় ধরনের কোনো সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ দেখা যায়নি।

এর উল্টা পাশে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রতিদিন রাতে বিভিন্ন শহরে সরকারের সমর্থকদের সমাবেশ দেখানো হচ্ছে।

নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়ে প্রশ্ন-গুঞ্জন

এদিকে, মার্চ মাসের শুরুতে উত্তরাধিকারী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত ইরানি সংবাদমাধ্যমে কেবল তার পাঠানো কয়েকটি লিখিত বার্তা দেখা গেছে। এরমধ্যেই ইসরায়েল তাকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।

ফলে, নতুন সর্বোচ্চ নেতার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জনের খবর জানা যায়।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলে আসছে যে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন, ধারাবাহিক হামলা ইরানের কমান্ড কাঠামোকে পঙ্গু করে দিয়েছে ও তাদের পাল্টা হামলার ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে গেছে।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ সংঘাত এখন শেষ হওয়ার দিকে এগোনো উচিত। তবে, বাস্তবে উল্টোটাই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্লষকেরা বলছেন, উত্তেজনা বৃদ্ধি দ্রুততর হয়েছে এবং আরও তীব্র হয়েছে, সেইসঙ্গে কমেছে যুদ্ধ শেষ করে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট উপায়।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ