যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধ বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা করছেন।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই সমুদ্রপথ দিয়ে যায়। যুদ্ধের মধ্যে তেহরান এটিকে একটি ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় প্রণালিটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
সংকীর্ণ এই প্রণালির দুই পাশে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকে আছে।
বৃহস্পতিবার ইরানি গণমাধ্যম জানায়, দেশটির পার্লামেন্ট প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের জন্য আইন পাসের উদ্যোগ নিচ্ছে।
তাসনিম ও ফার্স সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানের বরাতে একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং শিগগির ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির আইন বিভাগ তা চূড়ান্ত করবে।
এক কর্মকর্তা বলেন, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানকে ফি আদায় করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। অন্যান্য করিডোরেও যেমন পণ্য পরিবহনের সময় শুল্ক দিতে হয়, হরমুজ প্রণালিও একটি করিডোর। আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, তাই জাহাজ ও ট্যাঙ্কারগুলোর আমাদের শুল্ক দেওয়া স্বাভাবিক।
তবে এই আইনি কাঠামো ছাড়াই গত দুই সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এরই মধ্যে একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে বলে লয়েডস লিস্ট নামের শিপিং জার্নাল জানিয়েছে।
কেন টোল আরোপের সিদ্ধান্ত?
ইরান ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগর থেকে বিশ্বের অন্যত্র তেল ও এলএনজি বহনকারী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়েছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং এবং শিল্প উৎপাদন কমানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
প্রণালিটি উপসাগরীয় বেশিরভাগ তেল ও গ্যাস রপ্তানির একমাত্র পথ হওয়ায় বিভিন্ন দেশ ইরানের কাছে জাহাজ চলাচলের অনুমতি চেয়ে চাপ দিচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ শেষ করতে পাঁচটি শর্তের একটি হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করেছে।
রোববার ইরানের সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি ইরান ইন্টারন্যাশনালকে বলেন, কিছু জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধের খরচ আছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এই ফি নিতে হচ্ছে।
কত জাহাজ অপেক্ষায়?
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ জানান, প্রায় ২ হাজার জাহাজ প্রণালির দুই পাশে অপেক্ষা করছে।
ম্যারিটাইম গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড জানায়, অনেক জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ পথ নেওয়ার বদলে অপেক্ষা করছে।
১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী সপ্তাহে মাত্র ১৬টি জাহাজকে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু রেখে প্রণালি পার হতে দেখা গেছে। এছাড়া চারটি কার্গো জাহাজও ওই সময় পার হয়েছে।
টোল আদায়ের প্রক্রিয়া কী?
আইন পাস না হলেও গত দুই সপ্তাহে ২৬টি জাহাজ আইআরজিসির অনুমোদিত রুটে চলাচল করেছে, যেখানে আগে থেকে অনুমোদন নিতে হয়েছে।
জাহাজ মালিকদের প্রথমে আইআরজিসি-সংযুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাহাজের সব তথ্য দিতে হয়—যেমন নথি, আইএমও নম্বর, মালামাল, ক্রুদের নাম ও গন্তব্য।
এরপর আইআরজিসি নৌবাহিনী যাচাই করে অনুমোদন দিলে একটি কোড দেয় এবং নির্দিষ্ট রুট নির্দেশ করে।
প্রণালিতে ঢোকার পর রেডিওর মাধ্যমে কোড যাচাই করা হয়। অনুমোদন পেলে ইরানি নৌবাহিনী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে নেয়।
অনুমতি না পেলে কোনো জাহাজকে যেতে দেওয়া হয় না।
কারা টোল দিচ্ছে?
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বাদে অন্যান্য দেশের জাহাজ শর্তসাপেক্ষে পার হতে পারবে।
চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, মিশর ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু জাহাজ এরই মধ্যে পার হয়েছে।
কিছু জাহাজ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ফি দিয়েছে বলেও জানা গেছে, তবে কত টাকা দেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।
ভারত জানিয়েছে, তারা কোনো ফি দেয়নি।
আইনগত দিক
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনের ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার রয়েছে এবং তা স্থগিত করা যায় না।
তবে ইরান যুক্তি দিচ্ছে, তারা এই আইনে বাধ্য নয়, কারণ তারা এটি অনুমোদন করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালিটি খুবই সংকীর্ণ এবং ইরান ও ওমানের জলসীমা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির প্রধান সুলতান আল-জাবের এই পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইরান যখন হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করে, তখন এর প্রভাব পড়ে প্রতিটি দেশের অর্থনীতিতে—জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের দামে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম