প্রতিনিয়তই সড়কে ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। তবে গেলো ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সংঘটিত কিছু দুর্ঘটনা দেশবাসীর মনে দাগ কেটেছে। এর মধ্যে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী একটি বাস ডুবে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এরই মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ২৬ জনের মরদেহ। অদক্ষ চালকের কারণেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) মাধ্যমে বাস-ট্রাকের ৩ লাখ চালককে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রকল্প নিয়েছিল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। কিন্তু সাত বছর ধরে ঝুলে আছে প্রকল্পটি। সামনেও প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখছে না বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালে চালকদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পটি সাত বছরেও অনুমোদন হয়নি। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি চালক প্রশিক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হলেও প্রকল্পটি এখনো ঝুলে আছে। প্রতিটি ভারী যানবাহনের জন্য গড়ে দেড়জন চালক দরকার। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতির প্রয়োজন অনুযায়ী, প্রতিটি ভারী যানবাহনের জন্য দুজন করে চালক থাকার কথা। সে হিসাবে বর্তমানে চলমান ভারী যানবাহনের জন্য প্রায় দেড় লাখ চালকের ঘাটতি আছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ২০১৯ সালের পরে প্রকল্পের আর কোনো খোঁজখবর নেই। তবে প্রকল্পটি জনগুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বিআরটিসি সূত্র বলছে, সড়কে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে তিন লাখ চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রকল্প সংশোধন করে প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চালকের সংখ্যা অর্ধেকে নামানো হয়। এক দফা সংশোধন করে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। তাতে আপত্তি ওঠে। তারপর দ্বিতীয় দফা সংশোধনের কাজ হয়। ফলে কবে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। দক্ষ চালকের অভাবে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছেই। এ কারণে এ প্রশিক্ষণ প্রকল্প শুরু করা জরুরি বলে মনে করছেন সড়ক পরিবহন বিশ্লেষকরা।
ফাইল ছবি
‘ভারী যানবাহনের চালক তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান’ শীর্ষক প্রকল্পটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বাস-ট্রাকের তিন লাখ চালককে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রকল্পটি নিয়েছিল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। বিআরটিসির নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রশিক্ষণের প্রথম মডিউল ধরা হয়েছিল দুই সপ্তাহের এবং দ্বিতীয় মডিউল চার সপ্তাহের।
২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। পরে প্রকল্পে চালকের সংখ্যা এক লাখ ৫৭ হাজারে নামানো হয়েছে। প্রথমে ৯৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকার প্রকল্পে খাওয়া ও হাত খরচ ধরা হয়েছিল ৩৮৪ কোটি টাকা। প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। তাতে প্রশ্ন তোলে পরিকল্পনা কমিশন। পরে প্রস্তাব সংশোধনের কাজ শুরু করে বিআরটিসি। এ প্রকল্পের আওতায় চালকদের প্রশিক্ষণের সময়সীমা দুই সপ্তাহ ও চার সপ্তাহ করার প্রস্তাব করা হয়।
যারা হালকা যানবাহনের লাইসেন্স ব্যবহার করে ভারী গাড়ি চালাচ্ছেন তাদের দুই সপ্তাহ প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। যাদের হালকা যানবাহনের লাইসেন্স আছে, হালকা যানবাহন চালাচ্ছেন কিন্তু ভারী গাড়ি চালাতে ইচ্ছুক—তাদের চার সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে জেলায় জেলায় প্রশিক্ষণার্থীদের নির্বাচন করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন-যুগ্মসচিব) মো. রাহেনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তিন লাখ চালককে প্রশিক্ষণ দিতে আমরা প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি বাতিল করেছে। উন্নয়ন সহযোগী টাকা না দিলে আমরা কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবো। এই প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেই।’
এমওএস/এমএমকে