মতামত

পথে পথে মৃত্যুফাঁদ, উৎসবেও প্রকট শ্রেণি বৈষম্য

ঈদ—যে শব্দটি আমাদের চেতনায় আনন্দ, মিলন, আর ভালোবাসার প্রতীক হয়ে আসে, সেই ঈদই আজ অনেক পরিবারের কাছে হয়ে উঠছে গভীর শোকের নাম। নতুন জামার গন্ধ, সেমাইয়ের মিষ্টি স্বাদ, প্রিয়জনের সাথে আলিঙ্গনের উষ্ণতা—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে মুছে যায়, যখন পথে ঘটে যায় একটি ভয়ংকর দুর্ঘটনা।

ঈদের সময় দেশে নানা ধরনের দুর্ঘটনার খবর আমরা প্রায়ই শুনি—সড়কপথে একের পর এক বাস দুর্ঘটনা, রেলপথে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া কিংবা সংঘর্ষ। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক, প্রতিটিই আমাদের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে দুর্ঘটনাটি মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে, তা হলো ফেরি থেকে বাস নদীতে পড়ে ডুবে যাওয়ার ঘটনা।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি বাস, যেটি মানুষকে তাদের প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই পরিণত হলো মৃত্যুফাঁদে। ফেরি থেকে নদীতে পড়ে গিয়ে বাসটি নিমিষেই ডুবে যায়। অসংখ্য যাত্রী—শিশু, নারী, পুরুষ—গভীর পানির নিচে আটকে পড়ে নিঃশ্বাসের জন্য আকুল হয়ে ওঠে। তাদের শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিল, তা কল্পনা করাও কঠিন।

এই দুর্ঘটনা শুধু কিছু প্রাণ কেড়ে নেয়নি; এটি কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য স্বপ্ন, অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ। কোনো শিশুর জন্য তার বাবার আর ফেরা হবে না, কোনো মায়ের কোলে তার সন্তানের উষ্ণতা আর ফিরে আসবে না। যে মানুষগুলো ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে বেরিয়েছিল, তারা আর ফিরে আসেনি—ফিরেছে শুধু নিথর দেহ, আর অশেষ কান্না।

প্রশ্ন হলো—এ ধরনের দুর্ঘটনা কি অবশ্যম্ভাবী? নাকি এটি আমাদের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার ফল? প্রতি বছর ঈদ এলেই আমরা একই চিত্র দেখি—অতিরিক্ত যাত্রী বহন, যানবাহনের অযোগ্যতা, চালকের ক্লান্তি,  হেলপার দিয়ে বাস চালানো, পেট্রোল নেওয়া বা ফেরিতে গাড়ী তোলার সময় যাত্রীকে না নামানো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা। ফেরিঘাটগুলোতে নেই পর্যাপ্ত শৃঙ্খলা, নেই সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যেন মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই নেই এই বিশৃঙ্খলার মাঝে।

দৌলতদিয়ার এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো—আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় কত বড় ধরনের ঝুঁকি লুকিয়ে আছে। একটি ছোট ভুল, একটি সামান্য অসতর্কতা, কিংবা কিছু অব্যবস্থাপনা মুহূর্তেই কেড়ে নিতে পারে শতাধিক প্রাণ। অথচ এই ভুলগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল—যদি থাকতো কঠোর তদারকি, সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধ।

এই দুর্ঘটনাটি অন্য সব দুর্ঘটনা থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর নির্মমতা এবং অসহায়তার চিত্রের কারণে। সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত অনেক সময় মানুষ বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়, ট্রেন দুর্ঘটনাতেও কিছুটা প্রতিরোধ বা বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু একটি বাস যখন পানির গভীরে ডুবে যায়, তখন যাত্রীরা যেন একেবারেই বন্দি হয়ে পড়ে মৃত্যুর অন্ধকার গহ্বরে।

সম্ভবত সমস্যার শুরুটা বাইরে নয়, ভেতরে। যখন আমরা সম্পর্ককে সম্পত্তির মাপকাঠিতে মাপতে শুরু করি, তখনই ভালোবাসা হারাতে থাকে তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা। আর যতদিন না আমরা এই ভেতরের লোভ, হিংসা আর প্রতারণার প্রবণতাকে প্রশ্ন করি, ততদিন ঈদের আনন্দ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। ঈদকে আবার ঈদ করে তুলতে হলে আমাদের ফিরতে হবে সেই সহজ সত্যে—সম্পর্কের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই। জমি, সম্পদ, অর্থ ভাগ হয়ে গেলে আবার কেনা যায়, পাওয়া যায় কিন্তু ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আর ভালোবাসা কোনো বাজারে পাওয়া যায় না।

ভাবলেই গা শিউরে ওঠে—একটি বাস, যেখানে হয়তো কেউ ঈদের নতুন জামা পরে বসে ছিল, কেউ বাড়ি ফেরার আনন্দে ফোনে কথা বলছিল, কেউ হয়তো সন্তানকে কোলে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল প্রিয়জনের সাথে ঈদ কাটিয়ে শহরে ফেরার। হঠাৎই সেই বাসটি নদীর পানিতে তলিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দ রূপ নিল আতঙ্কে, আর আতঙ্ক রূপ নিল নিস্তব্ধ মৃত্যুর দিকে।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিকটি হলো—এই দুর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন, তাদের অনেকেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচার জন্য লড়াই করেছেন, কিন্তু বের হওয়ার কোনো পথ পাননি। একটি বন্ধ বাস, চারপাশে ঠান্ডা, অন্ধকার পানি—এ যেন জীবন্ত কবরের মতো এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এই চিত্র মানুষের মনে যে কষ্ট আর আতঙ্ক তৈরি করেছে, তা অন্য যে-কোনো দুর্ঘটনার চেয়েও গভীর।

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, কেন একটি বাস ফেরি থেকে নদীতে পড়ে যায়? কোথায় ছিল নিরাপত্তা ব্যারিয়ার? কেন চালক বা কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট সতর্ক ছিল না? দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রমেও দেখা যায় নানা সীমাবদ্ধতা—যথাযথ সরঞ্জামের অভাব, সমন্বয়ের ঘাটতি, এবং দেরিতে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হওয়া। এসব মিলেই একটি দুর্ঘটনাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে কঠোরভাবে। দ্বিতীয়ত, চালকদের কাজের সময় নির্ধারণ করে তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, ফেরিঘাট ও সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।

তবে শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। আমাদের প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ঝুঁকি না নেওয়া, অযোগ্য যানবাহনে না ওঠা, এবং যে-কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া—এই দায়িত্ব আমাদের সবার।

এই কারণেই ফেরি থেকে বাসডুবির ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি এক ধরনের সামষ্টিক ট্র্যাজেডি হয়ে উঠেছে। মানুষ শুধু নিহতদের জন্য শোক করছে না, তারা কল্পনা করছে সেই শেষ মুহূর্তগুলো—আর সেই কল্পনাই তাদের আরও বেশি ব্যথিত করে তুলছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একটি ছোট ভুল, একটি অব্যবস্থাপনা—আর তার মূল্য দিতে হয় অসংখ্য প্রাণ দিয়ে।

তাই এই দুর্ঘটনা আমাদের শুধু কাঁদাচ্ছে না, আমাদের ভাবতেও বাধ্য করছে। প্রশ্ন তুলছে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ? আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা কি মানুষের জীবনের মূল্য বোঝে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ আর কোনো ঈদ যেন এভাবে মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে না আসে।

আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ জীবনের সমাপ্তি। তাই সময় এসেছে জেগে ওঠার, দায়িত্ব নেওয়ার, এবং প্রতিটি প্রাণকে গুরুত্ব দেওয়ার। তবেই হয়তো একদিন ঈদ সত্যিই ফিরে পাবে তার প্রকৃত রূপ—শুধু আনন্দের, শুধুই জীবনের।

দুই.

ভয়ংকর বৈষম্য

সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া আর একটি ভিডিও আমাদের সমাজের এক ভয়ংকর বাস্তবতাকে আবারও উন্মোচিত করেছে। সেখানে দেখা যায়—একজন স্বামী, যিনি ভালোবাসা আর নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, তিনি-ই জনসমক্ষে তার স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর করছেন। ঘটনাটি যতটা দৃশ্যমান, তার পেছনের মনস্তত্ত্ব ততটাই জটিল এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন।

জানা যায়, নারীটি চেয়েছিলেন ঈদে বাবার বাড়ি যেতে। এই চাওয়াটা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি তার শৈশব, তার শিকড়, তার আবেগের সাথে জড়িয়ে থাকা একটি স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই চাওয়াটাই হয়ে দাঁড়ালো তার জন্য ‘অপরাধ’। এরপর তাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হলো—যেন এক ধরনের প্রতিস্থাপন, এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক সান্ত্বনা। আর সেখানে একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে—ছবি তুলতে না চাওয়াকে ঘিরে—স্বামীর ভেতরের দমন করা রাগ, ক্ষোভ, নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা হঠাৎ বিস্ফোরিত হলো সহিংসতায়।

এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে—এটি কি শুধুই রাগের বহিঃপ্রকাশ? নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা?

অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণের শিকড় থাকে ‘কন্ট্রোল’ বা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতায়। কিছু মানুষ সম্পর্ককে পারস্পরিক বোঝাপড়া হিসেবে নয়, বরং নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। তারা মনে করে, সঙ্গীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বাধীনতা—সবকিছু তাদের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। এই মানসিকতা মূলত অনিরাপত্তা, আত্মঅবিশ্বাস এবং ক্ষমতার বিকৃত ধারণা থেকে জন্ম নেয়।

যে পুরুষটি তার স্ত্রীকে জনসমক্ষে মারধর করলেন, তিনি আসলে হয়তো তার ভেতরের অস্থিরতা, ক্ষোভ, কিংবা হীনমন্যতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। স্ত্রী তার কথামতো বাবার বাড়ি না গিয়ে, আবার ছবি তুলতেও অস্বীকৃতি জানানো—এই দুইটি ছোট ‘না’ তার মানসিক কাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। কারণ তিনি অভ্যস্ত ‘হ্যাঁ’ শুনতে, অভ্যস্ত নিজের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত মনে করতে।

এই ধরনের মানুষের কাছে ভালোবাসা মানে অধিকার, সম্পর্ক মানে কর্তৃত্ব, আর ভিন্নমত মানেই অবাধ্যতা। ফলে যখনই তারা প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়, তখন তারা সংলাপের পথ বেছে নেয় না—সহিংসতার পথ বেছে নেয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পাবলিক স্পেসে বা জনসমক্ষে এই সহিংসতা ঘটানো। এটি কেবল রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি এক ধরনের ‘পাওয়ার ডিসপ্লে’ বা ক্ষমতা প্রদর্শন। যেন সে দেখাতে চায়—“আমি পারি, এবং কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।” এই মানসিকতা সমাজের নীরবতা থেকেও শক্তি পায়। যখন আশেপাশের মানুষ চুপ করে থাকে, তখন সেই সহিংসতা আরও বৈধতা পায় অপরাধীর চোখে।

অন্যদিকে, যে নারীটি এই সহিংসতার শিকার, তার অবস্থানটিও গভীরভাবে বোঝা জরুরি। বারবার এমন আচরণের শিকার হলে একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছা, আত্মসম্মান এবং ব্যক্তিত্ব হারাতে থাকে। সে ভাবতে শুরু করে—“আমার চাওয়া কি সত্যিই ভুল?” এই মানসিক ভাঙনই সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ এটি মানুষকে ভিতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়।

এই ঘটনাটি আমাদের শুধু একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন—যেখানে এখনো নারীর স্বাধীনতাকে অনেকেই হুমকি হিসেবে দেখে, যেখানে ‘না’ বলাকে অসম্মান হিসেবে নেওয়া হয়, এবং যেখানে ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকে দখলদারিত্ব।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। সম্পর্ক মানে সমান মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বোঝাপড়া—এই ধারণাটি পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সাথে, সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনি অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে হবে, যাতে কেউ এমন আচরণ করার আগে অন্তত একবার ভয় পায়।

সবশেষে একটি কথা স্পষ্ট করে বলা জরুরি—ভালোবাসা কখনোই আঘাত করে না, ভালোবাসা কখনোই অপমান করে না। যে সম্পর্ক মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়, তাকে ছোট করে, তাকে দমিয়ে রাখে—তা কোনোভাবেই ভালোবাসা নয়, তা কেবলই এক ধরনের নারী নির্যাতন।

এই নির্যাতনের চিত্র ভাঙতেই হবে। আজ নয়তো কাল—কিন্তু ভাঙতেই হবে। আর এজন্য এগিয়ে আসতে হবে সকল নারী, পুরুষ সকল মানুষের।

তিন

বিভাজনের ঈদ

ঈদ— মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় উৎসব, যে উৎসবের নাম শুনলেই মনে ভেসে ওঠে আলিঙ্গন, ক্ষমা, মিলন আর ভ্রাতৃত্বের অদৃশ্য সুতো—সেই ঈদ আজ অনেক পরিবারেই দ্বন্দ্বের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

যেখানে একসময় সকালের নামাজ শেষে কোলাকুলি ছিল হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা, সেখানে এখন অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভদ্রতার মুখোশ, ভেতরে জমে থাকা হিসাব-নিকাশের ওপর চাপানো এক ক্ষণিকের রঙিন পর্দা।

ঈদের চাঁদ উঠার সঙ্গে সঙ্গে যেমন আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে পড়ার কথা, তেমনি আজ অনেক পরিবারে শুরু হয় অদৃশ্য এক অঙ্ক কষার খেলা। কে কতটুকু খরচ করলো, কে বাবা মাকে বেশি সুবিধা দিতে পারলো, কে কতটুকু জমি পাবে, কে কার থেকে বেশি সুবিধা আদায় করবে, কোন ভাইকে কৌশলে কম দেওয়া যায়—এসব হিসাব যেন সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। পিতামাতার স্নেহের জায়গাটাও কখনো কখনো হয়ে পড়ে পক্ষপাতের দাঁড়িপাল্লা, যেখানে ন্যায়ের চেয়ে প্রিয়তা বা প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায়। আর সেই অন্যায় যখন সন্তানের চোখে ধরা পড়ে, তখন জন্ম নেয় ক্ষোভ, দূরত্ব, আর এক অদৃশ্য ভাঙন।

আমরা প্রায়ই বলি, গ্রামের মানুষ সহজ-সরল। হয়তো তাদের ভাষা সহজ, জীবনযাপন সরল, কিন্তু মানুষের ভেতরের জটিলতা তো শিক্ষার সার্টিফিকেট বা দূর থেকে মাপা যায় না। লোভ, হিংসা, প্রতারণা—এসব কোনো নির্দিষ্ট স্থানের সম্পদ নয়; এগুলো মানুষের অন্তর্গত দুর্বলতা। তাই গ্রাম হোক বা শহর—যেখানে স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, সেখানেই সম্পর্কগুলো ছোট হয়ে যায়।

দুঃখজনক হলো, এই প্রবণতা থেকে পিছিয়ে নেই শিক্ষিত প্রজন্মও। বরং অনেক সময় তারা আরও সূক্ষ্মভাবে, আরও পরিকল্পিতভাবে এই প্রতারণার চক্রে জড়িয়ে পড়ে। তারা জানে কীভাবে আইনকে ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে কাগজের খেলায় সত্যকে আড়াল করা যায়, কীভাবে মায়ার ভাষা দিয়ে বিশ্বাস ভাঙা যায়। ফলে প্রতারণা শুধু আবেগের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক, হিসেবি এবং নির্মম।

ঈদ তখন আর ঈদ থাকে না—তা হয়ে যায় একটি উপলক্ষ, যেখানে মানুষ একে অপরের কাছে আসে ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ে নয়, স্বার্থের টানে। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে সন্দেহ, কোলাকুলির ভেতরে থাকে দূরত্ব, আর মিষ্টির স্বাদে মিশে যায় তিক্ততার অদৃশ্য ছায়া।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এটাই কি আমাদের চাওয়া ছিল? যে ঈদ আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমা করতে, আনন্দ ভাগাভাগি করতে, একে অপরের ভালোবাসতে—সেই ঈদকে আমরা কেন নিজের স্বার্থের কাছে বিকিয়ে দিচ্ছি?

সম্ভবত সমস্যার শুরুটা বাইরে নয়, ভেতরে। যখন আমরা সম্পর্ককে সম্পত্তির মাপকাঠিতে মাপতে শুরু করি, তখনই ভালোবাসা হারাতে থাকে তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা। আর যতদিন না আমরা এই ভেতরের লোভ, হিংসা আর প্রতারণার প্রবণতাকে প্রশ্ন করি, ততদিন ঈদের আনন্দ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

ঈদকে আবার ঈদ করে তুলতে হলে আমাদের ফিরতে হবে সেই সহজ সত্যে—সম্পর্কের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই। জমি, সম্পদ, অর্থ ভাগ হয়ে গেলে আবার কেনা যায়, পাওয়া যায় কিন্তু ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আর ভালোবাসা কোনো বাজারে পাওয়া যায় না।

হয়তো সেদিনই সত্যিকারের ঈদ ফিরে আসবে এদেশের ঘরে ঘরে, যেদিন আমরা হিসাবের খাতা বন্ধ করে হৃদয়ের দরজা খুলে দেবো...

লেখক :  কবি ও কথাসাহিত্যিক।

এইচআর/জেআইএম