সারাদেশের মতো ঝিনাইদহেও লেগেছে জ্বালানি তেলের সংকটের আঁচ। ডিপো থেকে জেলার তেলপাম্পগুলো পর্যাপ্ত তেল বরাদ্দ না পাওয়ায় জেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে তেলের সংকট। এতে বিপাকে পড়েছেন মোটরসাইকেলে যাতায়াত নির্ভর কর্মজীবীরা। বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানির বিক্রয়কর্মীরা মোটরসাইকেলের জন্য চাহিদা মতো জ্বালানি পাচ্ছেন না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের মার্কেটিং ও বিপণন।
এদিকে ‘ড্রামে ডিজেল বিক্রির অনুমোদিত’ ডিলাররাও ডিপো থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না পাওয়ায় সেচ কাজের জন্য ডিজেল নিতে কৃষকরা ভিড় করছেন শহরের পাম্পগুলোতে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে পাম্পগুলো। চাহিদা মতো ডিজেল না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে ফসলি জমির সেচ কাজ। এতে চলতি মৌসুমের ফলন নিয়েও কৃষকের মাঝে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
সরেজমিনে জেলা শহরসহ অন্যান্য এলাকার তেলপাম্প ঘুরে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ছিল মোটরসাইকেলের জ্বালানির জন্য গ্রাহকদের দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন।
জেলা ফুয়েল পাম্প মালিক সমিতির সূত্র বলছে, জেলা শহর ও আশপাশে প্রায় ১৪টি তেল পাম্প রয়েছে। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জেলার পাম্পগুলো ডিপো থেকে আগের মতো তেল পাচ্ছে না। ফলে একইসঙ্গে একাধিক পাম্পে একযোগে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন ধাপে ধাপে গড়ে ৬ থেকে ৭টি তেল পাম্প থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে পাম্পগুলোতে বাড়ছে গ্রাহকের অস্বাভাবিক চাপ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে পাম্প কর্মীরা।
মোটরসাইকেল চালকরা জানান, বিভিন্ন কোম্পানি, এনজিও ও ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে কর্মরত চাকরিজীবীদের ভোগান্তি বেড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে হয়। তবে তারা প্রতিদিন পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না।
বিক্রয় প্রতিনিধি আবু রায়হান তৌফিক বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন বাজার ও গ্রামীণ এলাকায় যেতে হয়। গড়ে প্রতিদিন ৩ লিটার পেট্রোল লাগে। এখন আমরা তেল পাচ্ছি মাত্র ২০০ টাকার। এই তেল দিয়ে কোনো কাজই হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে মার্কেটিংয়ের পারফরম্যান্স ড্রপ হবে।
বিজয় বড়ুয়া নামে অপর এক বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, সংসার ও পেট চালাতে হলে আমাদের এই ছোট চাকরিই ভরসা। তেল পর্যাপ্ত না পাওয়ায় আমরা বাজারে বাজারে যেতে পারছি না। দোকানগুলোতে গিয়ে সঠিক সময়ে অর্ডার নিতে পারছি না। এতে করে সেলস কমে যাচ্ছে। মধ্যরাত থেকে তেলের জন্য পাম্পে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থেকেও ২০০ থেকে ৩০০ টাকার তেল পাচ্ছি। সারারাত তেলের জন্য নির্ঘুম থেকে সেই তেল নিয়ে মার্কেটিংয়ে যেতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলবো?
এদিকে গত তিন দিনে জেলার সকল পাম্পেই ডিজেলের সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদার অর্ধেক ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। প্রাপ্ত ডিজেল প্রতিটি পাম্পের সঙ্গে নির্ধারিত মাসিক চুক্তিভিত্তিক যানবাহনগুলো পাচ্ছে। বাকি তেল কৃষকদের মাঝে সীমিত পরিমাণে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে পর্যাপ্ত ডিজেল না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন জেলার কৃষকরা।
সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের এক কৃষক আছালত আলী বলেন, কয়দিন পরেই ধানের বাইল (ডগা/ছড়া) বের হবে। এখন পানির প্রয়োজন। সেচ পাম্প চালাতে দিনে ৪-৫ লিটার ডিজেল লাগে। পাম্পে এলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। সেচপাম্প প্রতি কৃষকদের ২ থেকে ৩ লিটার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার গাজীর বাজার এলাকার কৃষক মিনাজ উদ্দিন বলেন, কৃষকের কথা কেউ মাথায় রাখে না। আলমসাধু, নসিমন, বাস, প্রাইভেট কার আমাদের সামনে থেকে পাম্পে এসে ড্রামে ভরে ডিজেল নিয়ে যাচ্ছে। আমরা ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ডিজেল নিতে গেলে ৩ লিটারের বেশি দিচ্ছে না। শেষ সময়ে তেল না পেলে সেচ দেওয়া যাবে না। ধানের চরম ক্ষতি হবে।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ঝিনাইদহ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ৫৯ হাজার ৪৯১টি সেচপাম্পের মাধ্যমে ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে জেলায় ডিজেলচালিত সেচ পাম্প রয়েছে ৫১ হাজার ৫৪২টি। যা দিয়ে জেলার মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৪৩২ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। এছাড়া জেলায় মোট ৩৭ হাজার ৩০৮ হেক্টর জমিতে ৭ হাজার ৯৪৯ টি বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি সেচ দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহ ফুয়েল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম বলেন, ডিপো থেকে পাম্পগুলোতে চাহিদা মতো তেল দেওয়া হচ্ছে না। আগে যেখানে সপ্তাহে ৫০ থেকে ৫২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল ঝিনাইদহের পাম্পগুলো পেতো, এখন সেখানে ২৫ থেকে ৩০ হাজার লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে। আমরা যেরকম তেল পাচ্ছি, সেভাবেই সবাইকে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তেল সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ মোটরসাইকেল চালকরা। বিশেষ করে, তরুণ বয়সের ছেলেরা একই বাইক নিয়ে ঘুরে ফিরে সব পাম্পে গিয়ে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছে। অনেক মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট নেই। এগুলোতো প্রশাসনের দেখার দরকার। আমরা তেল না দিলে তারা পরিস্থিতি খারাপ করে ফেলে।
ঝিনাইদহ শহরের এমএ কালাম ফুয়েল পাম্পের মালিক হাসু মিয়া বলেন, পাম্পগুলোতে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। বাইকাররা বেশি তেল কিনছে, তারা জমা করছে। এই অতিরিক্ত ক্রয় করার প্রবণতার কারণেই কিছুটা ভোগান্তি বেড়েছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেছেন, পর্যাপ্ত পরিমাণ তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করেছে সরকার। এরই মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ১৭টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া বৈধ কাগজপত্র যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে মোটরসাইকেল চালকদের তেল দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি পাম্পে আমরা একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ‘ট্যাগ অফিসার’ হিসেবে নিয়োজিত করার নির্দেশনা দিয়েছি।
উল্লেখ্য জেলায় মোট ৩৬টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৬টি, শৈলকূপায় ৫টি, হরিণাকুণ্ডুতে ১টি, কালীগঞ্জ উপজেলায় ৮টি, কোটচাঁদপুরে ৩টি এবং মহেশপুর উপজেলায় ৩টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। তবে গড়ে প্রতিদিন জেলায় মোট ৬/৭টি পাম্প থেকে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সংকটের চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
এম শাহাজান/এফএ/জেআইএম