মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে পেট্রোলসহ জ্বালানি তেলের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও। পেট্রোল সংকটে গত দুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে পাবনার কাজিরহাট ও মানিকগঞ্জের আরিচা নৌপথে দ্রুতগতির স্পিডবোট সার্ভিস। এতে ভোগান্তি বেড়েছে যাত্রীদের। বোটমালিকদের লোকসানের পাশাপাশি কর্ম না থাকায় বিপাকে পড়েছেন চালকরাও।
বোটমালিক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কপথে পাবনা থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ৫-৬ ঘণ্টার। যানজটের কবলে পড়লে লাগতে পারে ৮-১২ ঘণ্টা। ঢাকার সঙ্গে পাবনাসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার দূরত্ব ঘুচিয়ে এ ভোগান্তি লাঘবে ২০১৬ সালে আরিচা-কাজিরহাট রুটে দ্রুতগতির স্পিডবোট সার্ভিস চালু করা হয়। এ স্পিডবোট সার্ভিস ব্যবহারে ৪-৫ ঘণ্টায় পাবনা থেকে ঢাকায় যাওয়া যেতো।
স্পিডবোট না পেয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিলেন মো. আহনাফ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফেরিতে নদী পার হতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। সেখানে কয়টা টাকা বেশি লাগলেও স্পিডবোটে দ্রুত পার হওয়া যায়। কিন্তু এখন তো সেই ভোগান্তিই পোহাতে হচ্ছে।’
আরেক যাত্রী হানিফ বলেন, ‘সরকার বলে তেল আছে অথচ পাবলিক ঠিকমতো তেল পাচ্ছে না। পাম্প থেকে তেল নিয়ে একপক্ষ ব্যবসা শুরু করেছে। নাটকীয়তার শেষ নেই। আমরা এতকিছু দেখতে চাই না। জনভোগান্তি থেকে মুক্তি চাই।’
বোটমালিকরা বলছেন, সাধারণত সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি বন্দরের ডিপো বা পেট্রোল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে পেট্রোল নিয়ে স্পিডবোট পরিচালনা করতেন মালিক ও চালকরা। কিন্তু বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আগের প্রক্রিয়ায় পেট্রোল মিলছে না। ফলে কয়েকদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চালানো সম্ভব হলেও সোমবার থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্পিডবোট সার্ভিস।
বোটমালিক সমিতির সভাপতি রইস উদ্দিন বলেন, ‘ঈদের আগেই স্পিডবোট বন্ধ হয়ে যেতো। কিন্তু লাখো মানুষের ঈদযাত্রায় ভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা জেলা প্রশাসককে পেট্রোল ম্যানেজ করতে অনুরোধ জানাই। পরে তিনি বেড়া ইউএনওকে নির্দেশ দিলে স্থানীয় পাম্পের নামে বরাদ্দ দিয়ে পেট্রোল সংগ্রহ করে ঈদযাত্রায় স্পিডবোট চালানো হয়। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সেই প্রক্রিয়ায় আর তেল মিলছে না। পাশাপাশি কিছু অসাধু চালক কোনোভাবে তেল সংগ্রহ করে ব্যক্তিগতভাবে বেশি ভাড়ায় যাত্রী পার করছিলেন। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর তেলের জোগান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বোট বন্ধ রাখা হয়েছে।’
বর্তমানে এই রুটে ৭৫টি বোট চলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন কাজিরহাট ও আরিচা প্রান্ত থেকে ১৫টি করে মোট ৩০টি বোট যাত্রী পারাপার করে। প্রতি ট্রিপে ২০-২২ লিটার পেট্রোলের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে প্রতিদিন ৬০০-৬৬০ লিটার তেল লাগে। সেটি এখন মিলছে না। ফলে বোট বন্ধ থাকায় দিনে মালিকদের আয় বাবদ ৬০-৭০ হাজার টাকাসহ প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা লোকসান হচ্ছে। চালকরা বেকার বসে সংসারের ব্যয় মেটাতে পারছেন না। মঙ্গলবারও তেল সংকট মেটাতে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেছি।’
এদিকে কাজ হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন বোটচালকরা। বোটচালক মিরাজ বলেন, ‘কয়েকদিন আগে থেকেই তেলের জন্য ট্রিপ মারায় সমস্যা হচ্ছিল। গত দুদিন ধরে তো বন্ধ। সংসারের ব্যয় তো থেমে নেই। ঈদের পর ব্যয় আরও বেশি। অথচ আয় বন্ধ। ভারি বিপদে আছি। দ্রুত তেল ম্যানেজ করে স্পিডবোট চালানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানাই।’
আরেক বোটচালক বাপ্পি বলেন, ‘একজন চালক দিনে দুই থেকে সর্বোচ্চ তিনটি ট্রিপ মারতে পারেন। প্রতি ট্রিপে ৫০০ টাকা করে মেলে। অর্থাৎ দুর্মূল্যের এই বাজারে আমাদের আয়ও বেশি না। সেখানে রোজগার বন্ধ থাকলে বিপদ।’
এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক মো. শাহেদ মোস্তফা বলেন, ‘ঈদে সংকটের ব্যাপারে আমাকে জানানোর পর সেটির একটি সমাধান করা হয়েছিল। নতুন করে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটির ব্যাপারে ইউনএনও বা কেউ জানাননি। খোঁজ নিয়ে স্পিডবোট চালুর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আলমগীর হোসাইন নাবিল/এসআর/এএসএম