ঠাকুরগাঁও জেলায় তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ডিজেল ও পেট্রোলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সেচ কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, ফলে চলতি বোরো মৌসুমে ফসল উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেচ পাম্প চালাতে প্রয়োজনীয় ডিজেল ও পেট্রোল না পাওয়ায় অনেকেই জমিতে পানি দিতে পারছেন না। বিশেষ করে বোরো ধান, ভুট্টা ও সবজি চাষের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
সদর উপজেলার কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন, পেট্রোল চালিত মেশিনের জন্য কৃষি অফিসারের কাছ থেকে কাগজ করে এনেছি। কিন্তু পাম্পে এসে তেল পাচ্ছি না। বোরো ধান ক্ষেতে পানি দিতে লাগে এখন তেলের অভাবে পানি দিতে পারচ্ছি না।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী এলাকার কৃষক জয়নাল জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পেট্রোল মিলছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা ও মোটরসাইকেল চালকরা আগেই তেল নিয়ে যাচ্ছেন। এতে আমরা সাধারণ কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
মহসিন আলী নামে এক কৃষক বলেন, সকাল ৯ টায় এসেছি তেল নিতে দুপুর আড়াইটায় পেলাম মাত্র ২০০ টাকার তেল। এই তেল দিয়ে একবিঘা জমিতে পানি দিতে পারবো না। আর এদিকে সরকার বলছে তেল আছে, তেলের কোনো সংকট নাই। তালে আমরা তেল পাচ্ছি না কেন।
এদিকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মজুতদারি ও অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি হওয়ায় কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেওয়া তথ্য মতে, জেলার মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৩ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা রয়েছে। যার মধ্যে বিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার হেক্টর জমি এবং ডিজেলচালিত যন্ত্রের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয় প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে জেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটে কৃষিক্ষেত্রে ঠাকুরগাঁওয়ে এই পর্যন্ত নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি। আর জেলায় সেচ পাম্প রয়েছে বিদ্যুৎ ও ডিজেল চালিত। ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র সেচ পাম্প আছে পেট্রোল চালিত। সেগুলো দিয়ে অধিক জমিতে সেচ দেওয়ার সম্ভব না। পেট্রোল চালিত পাম্প দিয়ে ৫-৭ কাঠা জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব ও সেই মেশিনগুলো আকারে ছোট এবং সহজে বহনযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, যারা বর্তমানে ফিলিং স্টেশন গিয়ে ভিড় করছেন সেগুলো কিন্তু কোনো সেচ পাম্প না। অধিকাংশই জেনারেটর। তারা কৌশলে সেচ পাম্পের কথা বলে সেগুলোতে তেল নিচ্ছেন। তারা মূলত অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য এইভাবে তেল সংগ্রহ করছেন। তাছাড়া গত কয়েকদিনে জেলা প্রাকৃতিকভাবে যে বৃষ্টি হয়েছে তাতে আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিন ফসলে সেচের প্রয়োজন হবে না।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসন বলছে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তারা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের মাঝে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে শুধু ফসলই নয়, পুরো মৌসুমের উৎপাদন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাই দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তানভীর হাসান তানু/এনএইচআর/জেআইএম