মতামত

টিকাদান কর্মসূচি: সংকট পেরিয়ে সক্রিয় উদ্যোগে সরকারের নতুন পথচলা

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচি যে কোনো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। বাংলাদেশেও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এটি দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের সক্রিয় ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপে টিকাদান কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) একসময় জনস্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সাফল্যের প্রতীক ছিল। এই কর্মসূচির মাধ্যমে পোলিও নির্মূল, ধনুষ্টংকার নিয়ন্ত্রণ এবং হেপাটাইটিস প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, একটি সময় এই সফল কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে, যার প্রতিফলন আজকের সংকটে স্পষ্ট।

সাম্প্রতিক টিকা সংকট এবং হাম-রুবেলায় শিশুমৃত্যুর ঘটনা আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। আক্রান্তদের বড় অংশই ছোট শিশু—প্রায় ৮২ শতাংশই ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং দীর্ঘদিনের গাফিলতি, পরিকল্পনার ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতার ফলাফল স্পষ্ট করে। নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হলে তার কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তা এখন আর অজানা নয়।

বিশেষ করে যখন দেখা যায় কেন্দ্রীয় গুদামে টিকার মজুত কমে গেছে, মাঠপর্যায়ে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং অনেক স্থানে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে—তখন এটি একটি দুর্বল ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। কোথাও টিকা নেই, কোথাও জনবল নেই—এই সমন্বয়হীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ত্রুটি নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার বহিঃপ্রকাশ।

নীতিগত কিছু সিদ্ধান্তও এই সংকটকে তীব্র করেছে। পূর্বের কার্যকর ক্রয় ও সরবরাহ কাঠামো যথাযথ বিকল্প প্রস্তুতি ছাড়া পরিবর্তন করায় নতুন ব্যবস্থায় বিলম্ব তৈরি হয়েছে। ফলে টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া এবং সময়মতো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও যদি টিকার ঘাটতি দেখা দেয়, তবে তা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে। হাম প্রতিরোধে ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। প্রথম ধাপে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে—তারা আগে টিকা নিয়েছে কি না, তা বিবেচ্য নয়। সংক্রমণ বেশি এমন এলাকা অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসূচি শুরু করা একটি লক্ষ্যভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের বর্তমান উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। তবে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও টেকসই করা এখন সময়ের দাবি। একটি সুসংগঠিত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর টিকাদান কর্মসূচিই পারে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

এ কর্মসূচির আওতায় আক্রান্ত, অসুস্থ বা সন্দেহভাজন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান করা হচ্ছে, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রমের তদারকি জোরদার করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরাসরি পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন, যা সরকারের আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার ইতিবাচক প্রতিফলন।

সরকার টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করেছে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের নির্ধারিত কেন্দ্রে নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত না হলে কোনো টিকাদান কর্মসূচিই সফল হতে পারে না—এ বাস্তবতা অনস্বীকার্য।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? অতীতের গাফিলতি নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে গেলে চলবে না। জবাবদিহি ছাড়া কোনো ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। কেন টিকার মজুত শূন্যে নেমে এলো, কেন সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা হলো না, কেন কার্যকর কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ল—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অবহেলার মূল্য অনেক বড়। যখন প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু ঘটে, তখন তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও। এই দায় নিরূপণ না করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কোভিড-পরবর্তী ‘ড্রপআউট’ সমস্যা সমাধান করে শিশুদের পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের বর্তমান উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। তবে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও টেকসই করা এখন সময়ের দাবি। একটি সুসংগঠিত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর টিকাদান কর্মসূচিই পারে ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এইচআর/এমএস