আন্তর্জাতিক

ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ বন্ধুত্বে ফাটল, ন্যাটোয় ভাঙনের সুর

ইরানকে কেন্দ্র করে আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কে নজিরবিহীন অবনতি ঘটেছে। কয়েক দশকের পুরনো ভূ-রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এখন তিক্ত বিচ্ছেদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা ইরান নীতি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অসম্মতি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোকে বিলুপ্তির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্পের ক্ষোভ ও ন্যাটো ত্যাগের হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ৭৭ বছরের পুরোনো এই জোট এতদিন পশ্চিমের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো।

এই বিরোধের ফলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই জোট ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আগে ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল—ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষায় যথেষ্ট খরচ করছে না। কিন্তু এখন তিনি প্রশ্ন তুলছেন, ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সাহায্য না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন তাদের রক্ষা করবে?

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা সবসময় তাদের পাশে ছিলাম, কিন্তু তারা আমাদের বিপদে পাশে নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে তাদের সাহায্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসা উচিত ছিল, ঠিক যেমন আমরা ইউক্রেন ইস্যুতে সাহায্য করেছি—যদিও ইউক্রেন আমাদের সমস্যা ছিল না।’

ইউরোপের অনড় অবস্থান

ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ এবং অদূরদর্শী’ হিসেবে দেখছেন। তাদের অভিযোগ, এই যুদ্ধের ব্যাপারে ইউরোপের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি। গত এক বছরে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দেওয়া এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো ট্রাম্পের নানা খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে ইউরোপের দেশগুলো এমনিতেই ক্ষুব্ধ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে তারা লড়তে নারাজ।

পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ভালো মিত্র হতে চাই, কিন্তু প্রেসিডেন্ট যা বলছেন, তা উপেক্ষা করা যাবে না।’

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতি এখন থেকে ইউরোপকেন্দ্রিক হবে। অর্থাৎ, দেশটি আর নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করতে পারছে না।

অস্তিত্ব সংকটে ন্যাটো?

ন্যাটোর মূল ভিত্তি হলো—একজন আক্রান্ত হলে সবাই এগিয়ে আসবে। কিন্তু ট্রাম্প এখন প্রশ্ন তুলছেন, যদি ইউরোপীয়রা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অভিযানে সাহায্য না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কেন ইউরোপকে রক্ষা করবে? ট্রাম্পের এই অবস্থানকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘একাকী সুপারপাওয়ার’ হওয়ার প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।

প্যারিস ভিত্তিক স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ফ্রাঁসোয়া হেইসবুর্গ বলেন, ‘আমেরিকানরা এখন সরাসরি ন্যাটো বিলুপ্তির কথা বলছে। এটি সম্পূর্ণ নতুন এবং বিপজ্জনক এক মোড়।’

নেপথ্যে অসহযোগিতার অভিযোগ

ট্রাম্পের রাগের অন্যতম কারণ হলো ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং বিশেষ করে স্পেন তাদের আকাশসীমা এবং বিমানঘাঁটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ফের খোলার জন্য নৌবাহিনী পাঠানোর মার্কিন অনুরোধও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।

যদিও গোয়েন্দা ও লজিস্টিক সাপোর্টে ইউরোপ কিছুটা সাহায্য করছে, তবে সরাসরি যুদ্ধে তারা জড়াতে সম্পূর্ণ নারাজ। ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রমণ করেছেন।

ভবিষ্যৎ কী?

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন বা কংগ্রেসের বিশেষ আইন ছাড়া প্রেসিডেন্ট এককভাবে ন্যাটো থেকে বের হতে পারেন না। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইন যা-ই হোক, রাজনৈতিক বিশ্বাস ভেঙে গেলে ন্যাটো অকার্যকর হয়ে পড়বে। যদি রাশিয়ার মতো দেশগুলো বুঝতে পারে যে ইউরোপ আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে না, তবে ন্যাটোর অস্তিত্ব কাগজের দলিল ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, আটলান্টিক সম্পর্কের এই ফাটল কেবল একটি সামরিক বিরোধ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছেদের শুরু। হেইসবুর্গের মতে, ‘এটি একটি ডিভোর্সের মতো; কিছু কথা একবার বলে ফেললে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।’

সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকেএএ/