দেশজুড়ে

হরিজন সম্প্রদায় থেকে সাফ জয়ী সানি দাস এখন সবার অনুপ্রেরণা

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা থেকে বেশি মনযোগ ছিল খেলাধুলায়। অনেক সময় স্কুল ফাঁকি দিয়েও মাঠে পড়ে থাকতেন। আর সেই খেলাধূলাই তাকে এনে দিলো পরিচিতি। তিনি এখন ফুটবল তারকা বনে গেছেন। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের তিনিও একজন অংশীদার।

এতক্ষণ যাকে নিয়ে বলা হচ্ছিলো তিনি নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া ঋষিপাড়া এলাকার বাসিন্দা সানি দাস। তিনি একজন হরিজন সম্প্রদায়ের সন্তান। হরিজন সম্প্রদায়ের প্রথম ফুটবল খেলোয়াড়ও তিনি।

সানি দাসের এই সফলতায় তার সম্প্রদায়ের মানুষজনও অনেক খুশি। যেদিন খেলা হচ্ছিল সেদিন টিভির স্ক্রিনে সবাই মিলে খেলা উপভোগ করেন। বাংলাদেশ জয়ী হওয়ার পর তারা দ্বিগুণ আনন্দে মেতে ওঠেন। যদিও ইনজুরির কারণে ফাইনাল খেলায় অংশ নিতে পারেননি সানি দাস। তারপরও তাদের যেন আনন্দের সীমা নেই। বাংলাদেশের জয় মানে সানি দাসেরই জয়।

সানি দাসের বাবা রাজ্জাক দাস নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে চাকরি করেন এবং তার মা মুক্তা রানী গৃহিণী। তাদের যৌথ পরিবার। বাবা চাচারা সবাই একসঙ্গে বসবাস করেন।

সানি দাসের চাচি আনন্দী রানী বলেন, আমার ভাতিজা জাতীয় দলে খেলছে এটা আমাদের জন্য অনেক ভালো লাগার বিষয়। সানী দাস ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিল। আমরা পড়ালেখার জন্য চাপ দিতাম, কিন্তু সে খেলাধুলার দিকে বেশি মনযোগী ছিল। অনেক সময় খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়েই মাঠে পড়ে থাকতো। এখন সে সফল হয়েছে; এটা আমাদের পরিবারের সকলের জন্য অনেক বড় পাওয়া।

সানি দাসের বাবা রাজ্জাক দাস হলেও সকলেই তাকে তার চাচা নয়ন দাসের ছেলে হিসেবে চেনে। নয়ন দাসই তার সকল বিষয় দেখাশোনা করেন। যখন যেখানে যা প্রয়োজন হয় তিনিই সবকিছু করে থাকেন।

চাচা নয়ন দাস বলেন, সানি দাসকে সকলেই আমার ছেলে হিসেবে চেনে। সব জায়গায় আমিই তাকে নিয়ে যেতাম। তার এই পর্যায়ে যাওয়ার পেছনে তার কোচের অনেক অবদান রয়েছে। তার কোচ বলতো সানি দাস ভালো খেলোয়াড় হবে, তাকে সুযোগ দাও। এখন সানী দাস জাতীয় দলে খেলছে। আমরা সবসময় তাকে পরিপূর্ণ সমর্থন দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, সানি দাস আমাদের হরিজন সম্প্রদায়ের গর্বিত সন্তান। সে হরিজন সম্প্রদায়ের হলেও কোথাও সে কোনো রকমের প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়নি। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

সানি দাসের বড় ভাই সঙ্গীত দাস বলেন, আমরা দুইভাই অনেক কষ্ট করে খেলাধুলা করেছি। আমার ছোটভাই ভালো খেলতো; তাকে আমরা সাপোর্ট দিয়েছি। সে এখন জাতীয় দলে খেলছে। এটা আমাদের হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য অনেক গর্বের। আমাদের নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য গর্বের বিষয়।

সানির মা মুক্তা রানী বলেন, মা হিসেবে আমার আশা ছিল ছেলেরা যেন ভালো কিছু করে। কিন্তু সে পড়াশোনায় বেশি মনযোগী ছিলো না। সে খেলাধুলা করেই সফল হয়েছে। আমার ছেলে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে, এটা আমাদের সকলের জন্য গর্বের বিষয়।

সানি দাসের কোচ আজমল হোসেন বিদ্যুত বলেন, হরিজন সম্প্রদায় থেকে ফুটবলে আসা অনেক কঠিন। কারণ এখানে সাধারণত মাদকের আখড়া থাকে। সানি দাসকে তার চাচা নয়ন দাস আমার কাছে নিয়ে এসেছিল। আমাদের একাডেমি থেকে অনেকেই জাতীয় দলে খেলেছে। সানি দাস একজন ব্যতিক্রম খেলোয়াড়। সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল জাতীয় দলে খেলবে। ছোটকাল থেকেই যাদের আগ্রহ থাকে তারাই খেলোয়াড় হয়ে থাকে; সানি দাসের মধ্যে এটা ছিল। সে নিয়মিত খেলাধুলা করতো। সে সকল জাতীয় দলেই খেলছে। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করছি।

তিনি আরও বলেন, হিন্দু ধর্মালম্বী অনেকেই বাংলাদেশের জাতীয় দলে খেলেছে। কিন্তু হরিজন সম্প্রদায় থেকে সানি দাসই প্রথম। আশা করি তার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দীর্ঘদিন খেলবে। আমাদের বঙ্গবীর সংসদ ফুটবল একাডেমি থেকে তাকে যত ধরনের সমর্থন প্রয়োজন হয় আমরা দিব। আমরা চেষ্টা করি আমাদের এখানে যারা খেলে সকলকেই ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক মো. রায়হান কবির বলেন, স্বাভাবিকভাবেই নারায়ণগঞ্জের একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমি অত্যন্ত খুশি। এই বিষয়টা নিয়ে আমরা গর্ববোধ করছি। প্রোটকল অনুযায়ী যতটুকু সম্মাননা বা সংবর্ধনা দেয়ার দরকার আমরা ততটুকু দেবো। তিনি যেহেতু হরিজন সম্প্রদায়ের, এটা নিঃসন্দেহে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক। এই বিষয়টা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো যাতে করে অন্যরা আরও উৎসাহিত হয়।

এফএ/এমএস