ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবম দিনে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এসব কোম্পানির কাছে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
সোমবার (৬ এপ্রিল) কুমিল্লা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান। এদিন সংসদে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
অর্থমন্ত্রী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেন। তারা হলেন১. এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড২. এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড৩. সালাম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড৪. এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড৫. সোনালী ট্রেডার্স৬. বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড৭. গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড৮. চেমন ইস্পাত লিমিটেড৯. এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড১০. ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড১১. কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড১২. দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড১৩. পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড১৪. পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড১৫. প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড১৬. কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড১৭. মুরাদ এন্টারপ্রাইজ১৮. সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড১৯. বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স লিমিটেড২০. রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড।
খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
১. ১০ শতাংশের বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা এবং শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা সমাধানে ব্যাংক থেকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
২. বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত প্রতিটি ব্যাংকার সভায় ব্যাংকভিত্তিক শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি যাচাই।
৩. শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেশি এমন ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ নিষ্পত্তি কৌশলসংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন।
৪. ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধিত) আইনে সংজ্ঞায়িত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৬ (তারিখ: ১২ মার্চ ২০২৪) এর মাধ্যমে শনাক্তকরণ ও করণীয় নির্ধারণ।
৫. বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৪/২০২৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকের বিদ্যমান আইন বিভাগ শক্তিশালী করতে নির্দেশনা প্রদান।
৬. বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আগামী ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ন্যূনতম ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ (বিআরপিডি সার্কুলার নং-১১/২০২৪)।
৭. ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ করা।
৮. আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণক্ষতিভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা বাস্তবায়ন; পাশাপাশি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জামানতের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
অর্থমন্ত্রী জানান, এসব ছাড়াও খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানে আরও কিছু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সেগুলো হলো১. বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ—ব্যাংক কোম্পানি আইন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট আইন, অর্থ ঋণ আদালত আইন, দেউলিয়া আইন—সংশোধনের কার্যক্রম চলমান।
২. স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণের পুনঃতফসিল নীতিমালা পর্যালোচনা ও হালনাগাদ।
৩. খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ।
৪. নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের চিহ্নিত করে প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালা হালনাগাদ।
৫. একজন ঋণগ্রহীতার জন্য সমগ্র ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ।
৬. ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য প্রযোজ্য কিছু ব্যবস্থা অন্য খেলাপিদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগে আইনি সংস্কারের উদ্যোগ।
৭. অর্থ ঋণ আদালতের বিচারক প্যানেলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তকরণ।
৮. ঋণখেলাপিরা যাতে রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থগিত করতে না পারে, সে লক্ষ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ।
৯. বেসরকারি খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন।
তালিকাটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, শীর্ষ ঋণখেলাপিদের মধ্যে কোনো কোনো গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড ও চেমন ইস্পাত লিমিটেড তালিকায় রয়েছে।
এছাড়া পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারার দুটি প্রতিষ্ঠান—কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড ও জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড এবং বেক্সিমকো নামসংবলিত দুটি প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ও বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স লিমিটেড তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এমওএস/এসএইচএস