ধর্ম

পাদ্রীর প্রশ্ন যেভাবে পৌঁছে দিয়েছিল ইসলামের ছায়ায়

সত্যের প্রতি অদম্য আকর্ষণ, অজানাকে জানার গভীর তৃষ্ণা এবং সত্য উপলব্ধির পর নির্ভীকভাবে তা গ্রহণ করার বিরল সাহস—এই তিনটি গুণের অপূর্ব সমন্বয় আমরা দেখতে পাই সাহাবিদের জীবনে। তাদেরই একজন হলেন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)। তার জীবনের সূচনালগ্নে ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি শুধু একটি ঐতিহাসিক বিবরণ নয়; বরং এটি সত্য অনুসন্ধানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়।

হযরত তালহা (রা.) ছিলেন কোরাইশ বংশের একজন সম্ভ্রান্ত ও সফল ব্যবসায়ী। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে তিনি একবার সিরিয়ায় যান। সেই সময় আরব ব্যবসায়ীদের জন্য সিরিয়া ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে বিভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষের সমাগম ঘটত। একদিন সিরিয়ার এক ব্যস্ত বাজারে দাঁড়িয়ে তালহা (রা.) হঠাৎ এক অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হন, যা তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

বাজারের ভিড়ের মধ্যে তিনি শুনতে পেলেন এক ব্যক্তির জোরালো আহ্বান—সে জানতে চাইছে, এখানে কোনো মক্কাবাসী আছে কি না। প্রথমে বিষয়টি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও কৌতূহল তাকে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে। তিনি নিজেকে মক্কার অধিবাসী হিসেবে পরিচয় দিলে লোকটি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এরপর সে এমন একটি প্রশ্ন করল, যা তালহার অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করল—মক্কায় কি ‘আহমাদ’ নামে কেউ নবুয়্যতের দাবি করেছেন?

এই প্রশ্নের মধ্যে ছিল গভীর তাৎপর্য। তালহা (রা.) তখনও এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তিনি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, এই আহমাদ কে? তখন সেই ব্যক্তি, যিনি ছিলেন একজন খ্রিষ্টান পাদ্রী, তাকে জানালেন—এটি সেই প্রতিশ্রুত নবীর আগমনের সময়, যার কথা বহু পূর্বে ইঞ্জিলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাদ্রীর এই কথাগুলো তালহার (রা.) হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার অন্তরে এক অজানা আকর্ষণ জন্ম নেয়—যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে সত্যের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পাদ্রী তাকে পরামর্শ দিলেন—সবকিছু ছেড়ে দ্রুত মক্কায় ফিরে যাও এবং সেই নবীর সাক্ষাৎ লাভ করো।

এই কথাগুলো তালহার (রা.) মনে এমন প্রভাব ফেলল যে, তিনি আর ব্যবসার কাজে মনোযোগ দিতে পারলেন না। তার চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল ‘আহমাদ’—এই অজানা অথচ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সত্য জানার জন্য তাকে মক্কায় ফিরতেই হবে।

মক্কায় ফিরে এসে তার অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। তিনি যাকে-তাকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন—আহমদ নামে কেউ কি নবুওয়াতের দাবি করেছেন? প্রথমদিকে লোকজন তার প্রশ্নে বিস্মিত হয়, কেউ কেউ তাকে উপহাসও করে। কিন্তু তালহা (রা.) থেমে যান না। তার ভেতরের সত্যপিপাসা তাকে অবিরাম অনুসন্ধানে প্রেরণা দেয়।

অবশেষে তিনি জানতে পারেন, মুহাম্মদ (সা.) নবুয়্যতের ঘোষণা দিয়েছেন এবং তার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছে। আরও জানতে পারেন, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইতোমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছেন

এই তথ্য তালহার (রা.) জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি আবু বকরের (রা.) সততা, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার প্রতি গভীর আস্থা রাখতেন। তাই তিনি সরাসরি তার কাছে যান এবং বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হন। আবু বকর (রা.) তাকে শুধু সত্যের সংবাদই দেননি, বরং আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াতও দেন। তিনি বুঝিয়ে বলেন, এক আল্লাহর ইবাদতই মানব জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য।

আবু বকরের (রা.) এই আন্তরিক আহ্বান তালহার (রা.) হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন—এটাই সেই সত্য, যার সন্ধান তিনি করছিলেন।

এরপর আবু বকর (রা.) তাকে নিয়ে যান নবীজির (সা) দরবারে। সেখানে উপস্থিত হয়ে তালহা (রা.) এক অপূর্ব প্রশান্তি অনুভব করেন—যেন তার দীর্ঘদিনের খোঁজাখুজি শেষ হয়েছে। তিনি আর দেরি করেননি। সেখানেই তিনি কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

তালহার (রা.) বয়স তখন ছিল মাত্র সতের বছর—এটি এমন একটি বয়স, যখন অধিকাংশ মানুষ জীবনের দিকনির্দেশনা খুঁজে পায় না। কিন্তু তালহা (রা.) সেই বয়সেই সত্যকে চিনে নিতে সক্ষম হন।

পরবর্তীকালে তালহা (রা.) ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত হন। তিনি শুধু একজন সাহাবীই নন, বরং ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন যোদ্ধা, দানশীল ব্যক্তি এবং সত্যের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।

ওএফএফ