মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি খাতে। তেলের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। অনেক পাম্পে বন্ধ রয়েছে তেল বিক্রি, যেগুলো খোলা আছে সেখানে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে যানবাহন চালকদের।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই তেল সংকটের প্রভাব এখন দৃশ্যমান রাজধানীর সড়কেও। চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর মোটরসাইকেল চালকেরা। বিশেষ করে খাবার ডেলিভারি ও রাইড শেয়ারিং পেশায় জড়িতরা পড়েছেন বেশি বিপাকে। তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন আয় কমে গেছে প্রায় অর্ধেকে।
ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার কর্মী মোহাম্মদ রাসেল জানান, তিনি টিভিএস এক্সএল মোটরসাইকেলে খাবার সরবরাহ করেন। ছোট ট্যাংক হওয়ায় একবারে সাড়ে চার লিটারের বেশি তেল নিতে পারেন না। প্রতিদিন তেল নিতে গিয়ে ৪-৫ ঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়ায় এখন আর দিনে এক শিফটও ঠিকমতো কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আগে দিনে দুই শিফটে কাজ করে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা আয় করলেও এখন তা কমে এক হাজার টাকায় নেমে এসেছে। চার সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি এখন চরম কষ্টে আছেন।
তিনি বলেন, কোনো কোনো দিন সকালে দাঁড়িয়ে বিকেলে তেল পাই। এত খারাপ সময় আগে কখনো আসেনি।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় স্যাম অ্যাসোসিয়েট পেট্রোল পাম্পে অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে কথা বলেন জাগো নিউজের এ প্রতিবেদক। তাদের মধ্যে ২৪ জন বেসরকারি চাকরিজীবী, ৫ জন ছাত্র ও একজন সরকারি কর্মচারী রয়েছেন।
আরও পড়ুনযুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও জ্বালানির দাম স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে ব্যাটারিচালিত রিকশা গলার কাঁটা, দিনে গিলছে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
এছাড়া ৫ জন ফুডপান্ডার চালাক, ৮ জন রাইড শেয়ারিংয়ের চালক এবং ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশার ৭ জন। অধিকাংশ মোটরসাইকেলেই এক থেকে ৩ লিটারের মধ্যে তেল থাকতে দেখা গেছে। তবে তেল থাকার পরও কিছু যানবাহনে তেল নিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের ভাষ্য, অফিস খোলা থাকায় সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল সংগ্রহ সম্ভব হয় না তাদের। ফলে ছুটির দিনে বাধ্য হয়ে তেল কিছুটা থাকার পরও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষায় মোটরসাইকেল চালকরা। লাইনের শেষ অংশ মিরপুর-২ নম্বর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। তপ্ত রোদে অনেকেই মোটরসাইকেল রেখে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন।
কল্যাণপুরের বাসিন্দা আবদুল ওয়াহাব বলেন, সকাল ৯টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সংকটের কারণে মোটরসাইকেল খুব একটা বের করি না। আজ ছুটির দিন, তাই তেল নিতে এসেছি।
হার্ট ফাউন্ডেশনের কর্মচারী হৃদয় বলেন, সপ্তাহের অন্যদিন সময় না পাওয়ায় শুক্রবারই তেল নিতে আসতে হয়।
মিরপুরের নেহাল অভিযোগ করে বলেন, এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মাত্র ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে, এটা অন্যায়।
রাইড শেয়ারিং চালক মুনতাসির আলম বলেন, অনেক পাম্পেই তেল দেওয়া হচ্ছে না, ফলে যেসব পাম্প খোলা থাকে সেখানে অতিরিক্ত ভিড় হয়। মাত্র ৫০০ টাকার তেলে সারাদিন চলে না। বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হয়।
ফুডপান্ডার আরেক চালক রাশেদ জানান, দুই থেকে তিনদিন পরপর তেল নিতে হচ্ছে। লাইনে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা চলে যায়, অন্য কাজের জন্য সময়ই থাকে না।
সাভার থেকে তেল নিতে আসা স্কুলশিক্ষক আজিম বলেন, সাভারে অবস্থা আরও খারাপ। একেক জায়গায় একাধিক লাইন দেখা যায়। অনেক পাম্প বন্ধ। এজন্য মিরপুরে তেল নিতে এসেছি। ভেবেছিলাম ঢাকায় আসলে সহজেই তেল পাবো। কিন্তু, এসে দেখছি একই অবস্থা।
কেউ কেউ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। চাকরিজীবী রিয়াদ বলেন, এটা বৈশ্বিক সংকট, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
তবে, ব্যবসায়ী মিশু মনে করেন, তেলের দাম বাড়ালে সংকট কিছুটা কমতে পারে।
এক প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক খোরশেদ জানান তিনি এক মাস পর তেল নিতে এসেছেন। জাগো নিউজকে খোরশেদ বলেন, আমার বাসার কাছেই অফিস। এদিক ওদিক কম যাই, এ কারণে তেল কম লাগে।
শ্যামলী এলাকার দোকানি আল মামুন বলেন, কয়েকদিন আগে সকাল ৯টায় তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে বিকেল ৪টায় পেয়েছি। নাওয়া-খাওয়া সব শেষ হয়ে গেছে।
কেআর/কেএসআর