ভোরের আলো ফুটতেই যে বাংলাবান্ধায় শুরু হতো পাথর ভাঙা মেশিনের মুহুর্মুহু শব্দ আর হাজারো শ্রমিকের কর্মব্যস্ততা, সেখানে এখন বিরাজ করছে এক গুমোট নীরবতা। দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ে গড়ে ওঠা শক্তিশালী পাথর ভাঙা শিল্প এখন গভীর সংকটে। চলমান তীব্র জ্বালানি সংকটে থমকে গেছে ডিজেলচালিত পাথর ক্রাসিং মেশিনগুলো, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কয়েক হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকার ওপর।
বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাবান্ধা বন্দর দিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। পাথর নির্ভর এই বন্দর দিয়ে সীমিত আকারে তৈরি খাদ্য-পণ্য (প্রসেস ফুট), ইলেক্ট্রনিক পণ্য, পাট এবং পাটজাত বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়। ভারত ও ভুটান থেকে পাথর ছাড়াও গম, আখের মলাসেসসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়। এই বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণে পাথর আমদানির ফলে এখানে পাথর ভাঙা শিল্প বেশ শক্তিশালী।
তবে দেশের চলমান জ্বালানি সংকটে বন্দরের মূল কার্যক্রম এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। প্রতিদিন পাথরের ট্রাক আসছে, পণ্য যাচ্ছে। কিন্তু বন্দরের আশপাশে গড়ে ওঠা পাথর ভাঙা শিল্প পুরোপুরি নির্ভরশীল ডিজেল চালিত মেশিনের ওপর। এখানে আমদানি করা এবং নদী থেকে তোলা পাথর ভাঙা হয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের অভাবে পাথর ভাঙা মেশিন একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন পাথর শ্রমিকরা।
আরও পড়ুনজ্বালানি সংকটে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে স্থবিরতা, বেড়েছে ট্রাকের ভাড়া
জ্বালানি তেলের অভাবে মেশিন চালাতে না পেরে বসে আছেন এমন একজন পাথর ভাঙা মেশিন শ্রমিক মো. আমিরুল ইসলাম। পাথর শ্রমিক আমিরুল ইসলাম জানান, একটি মেশিনে প্রতিদিন অন্তত ১৮-২০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মিলছে মাত্র ৫ লিটার। ফলে তিন দিনের তেল জমিয়ে একদিন মেশিন চালাতে হচ্ছে তাদের। এই অনিশ্চয়তায় কাজ হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে শ্রমিকদের।
আরেক পাথর শ্রমিক জাবেদুল ইসলাম বলেন, এখানে পাথর ভাঙা মেশিন আমাদের আয় ইনকামের ভরসা। এই মেশিন বন্ধ হলে আমাদের খুব কষ্ট হয়। পাথর ভাঙা মেশিন না চলায় পাথর ব্যবসাও চলে না। আমরা নদী থেকে পাথর উত্তোলন করি। কিন্তু মাহাজন আমাদের টাকা দিতে পারেন না। অন্য কোনো কাজ কাম নাই। খুব কষ্ট করেই আছি।
জ্বালানি সংকটের কারণে বিপাকে পড়েছেন বাংলাবান্ধা এলাকার পরিবহন শ্রমিকরাও। স্থানীয় মহানন্দা নদী থেকে পাথর উত্তোলনের পর নদী এলাকা থেকে সেই পাথর ট্রাক্টর দিয়ে পরিবহন করে পাথরের বিভিন্ন সাইড এবং পাথর ভাঙা এলাকায় পরিবহন করা হয়। জ্বালানির তেলের অভাবে ঠিকমতো পাথর পরিবহন করতে পারছেন না ট্রাক্টর চালকরা। যার ফলে এই খাতের শ্রমিকরাও রীতিমতো অলস সময় পার করছেন।
আরও পড়ুনজ্বালানি সংকটে মিলছে না ট্রাক, জমছে পণ্যের স্তূপ
এমনই একজন চালক আজিমুদ্দিন। তিনি জানান, নদী থেকে পাথর সাইটে নিতে দিনে ১৫-২০ লিটার ডিজেল দরকার হয়, কিন্তু পাম্প থেকে ৫-৭ লিটারের বেশি মিলছে না। কাজ ফেলে পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় ট্রাক্টর চালানো বন্ধ হয়ে গেছে।
নীলফামারির জলঢাকা থেকে আসা নারী পাথর শ্রমিক মিনা বেগম বলেন, আমরা বাংলাবান্ধা এলাকায় থাকি। স্বামীসহ দীর্ঘদিন থেকে এখানে আমি পাথর ভাঙার কাজ করি, যা দিয়ে চলে আমাদের সংসার। তেলের জন্য আমাদের মেশিন চলে না।
শুধু পাথর ও পরিবহন শ্রমিক নয়, জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে পুরো স্থলবন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। ভাঙা পাথর উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিবহন, লোড-আনলোড শ্রমিকসহ পাথর ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলেন জানান স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা।
আরও পড়ুনতেল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, সেচ সংকটে দুশ্চিন্তায় কৃষকরাজ্বালানি সংকটে বিপাকে মোটরসাইকেল মেকানিকরা, স্থবির পার্টস ব্যবসা
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের আমদানি রপ্তানিকারক আনছার আলী বলেন, আমার পাথর ক্রাসিং মেশিন রয়েছে। অনেক শ্রমিক আমার এখানে কাজ করেন। স্থলবন্দরেও অনেক মানুষ কাজ করেন। জ্বালানি তেল না পাওয়ার কারণে এখানে আমাদের অনেক মেশিন বন্ধ রয়েছে। ৭-৮ দিন ধরে মেশিন চালাতে পারছি না। আমার মতো অনেকের একই অবস্থা। এখানে অনেক শ্রমিক বসে আছেন, কাজের অভাব। তেলের সমস্যা সমাধান হলে স্থলবন্দর সংশ্লিষ্ট সবার জন্য ভালো হবে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এই বন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি পাথর আমদানি হয়। এর বাইরে গম, আখের মোলাসেস আমদানি হচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার জন্য সম্ভাবনাময় এই বন্দর দিয়ে বিভিন্ন প্রকার পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুযোগ রয়েছে। এখানে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখী বাণিজ্যিকীকরণ করা হলে এই স্থলবন্দর আরও সক্রিয় হবে এবং দেশের রাজস্ব আয় বহুগুণে বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটে আমাদের আমদানি রপ্তানিতে কোনো প্রভাব পড়েনি। এখানে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্বাভাবিক রয়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় এবার রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আমদানিও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি। বর্তমানে এখানে তৈরি খাদ্য পণ্য (প্রসেস ফুট), ইলেক্ট্রনিক পণ্য, পাট এবং পাটজাত বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
সফিকুল আলম/কেএইচকে/জেআইএম