আবুল কালাম আজাদ
পহেলা বৈশাখ এলেই মনটা অদ্ভুত এক আলোড়নে ভরে ওঠে। দূরদেশের ব্যস্ত জীবনে দিন-তারিখের হিসাব অনেক সময়ই যান্ত্রিক হয়ে যায়, কিন্তু বাংলা নববর্ষ যেন সেই যন্ত্রণা ভেঙে আমাদের টেনে নিয়ে যায় শেকড়ের কাছে। আমি একজন প্রবাসী হাজার মাইল দূরে থেকেও বৈশাখ আমার কাছে কেবল একটি দিন নয়, এটি আমার পরিচয়, আমার শিকড়, আমার অস্তিত্বের এক অনিবার্য অংশ।
ছোটবেলায় বৈশাখ মানেই ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। ভোরের আলো ফোটার আগেই মা ঘুম থেকে ডাকতেন, নতুন কাপড় পরে আমরা বের হতাম রমনা বটমূলের দিকে। চারপাশে লাল-সাদা পোশাকের ঢেউ, কণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ সে এক অপার্থিব অনুভূতি। পান্তা-ইলিশের গন্ধ, মেলা, মুখোশ, আর হাসিমুখে ভরা মানুষ সব মিলিয়ে এক উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত দিন। তখন বুঝিনি, এই দিনগুলোই একদিন আমার সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে উঠবে।
আজ প্রবাসে বৈশাখ আসে অন্যরকমভাবে। এখানে নেই রমনার বটমূল, নেই সেই চিরচেনা মেলা কিংবা ঢাকের শব্দ। তবুও বৈশাখ আসে আমাদের হৃদয়ে, আমাদের ছোট ছোট আয়োজনের মধ্যে দিয়ে। প্রবাসী বাঙালিরা মিলে ছোট্ট পরিসরে বৈশাখ উদযাপন করি। কেউ রান্না করে পান্তা-ইলিশ, কেউ নিয়ে আসে মিষ্টি, কেউ আবার গান গেয়ে বা কবিতা আবৃত্তি করে মনে করিয়ে দেয় আমরা ভুলে যাইনি আমাদের শেকড়।
প্রবাস জীবন মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। এখানে টিকে থাকতে হলে প্রতিদিন লড়াই করতে হয় সময়, ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছুর সঙ্গে। কিন্তু এই লড়াইয়ের মাঝেও বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোথা থেকে এসেছি। এই দিনটি যেন আমাদের আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার।
একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি প্রবাসে থাকলে দেশের প্রতি ভালোবাসা যেন আরও গভীর হয়। যেসব জিনিস দেশে থাকতে স্বাভাবিক মনে হতো, সেগুলোই এখানে অমূল্য হয়ে ওঠে। একটি বাংলা গান, একটি পরিচিত খাবার, কিংবা বৈশাখের একটি শুভেচ্ছা সবকিছুই হয়ে ওঠে আবেগের অংশ। বৈশাখ তাই কেবল উৎসব নয়, এটি আমাদের হৃদয়ের সঙ্গে দেশের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন।
তবে প্রবাসের বৈশাখে কিছু প্রশ্নও জাগে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা এখানে জন্ম নিচ্ছে বা বড় হচ্ছে তারা কি এই সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারবে? তারা কি জানবে বৈশাখের ইতিহাস, তার তাৎপর্য? এই দায়ভার আমাদেরই, প্রবাসী বাবা-মা, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং সচেতন নাগরিকদের।
আমাদের উচিত নতুন প্রজন্মকে এই সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা, গান, গল্প, খাবার, পোশাক সবকিছুর মাধ্যমে। প্রযুক্তির এই যুগে দূরত্ব আর বাধা নয়; বরং সুযোগ। আমরা চাইলে এই সংস্কৃতি নতুনভাবে, নতুন মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারি।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় নতুন করে শুরু করতে, পুরনো গ্লানি ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে। এই শিক্ষা আজকের বিশ্বেও সমান প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তি, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্র সবার জন্যই এটি এক নবজাগরণের বার্তা।
দূরদেশে বসে যখন বৈশাখের শুভেচ্ছা জানাই, তখন মনে হয় আমরা হয়তো ভৌগোলিকভাবে দূরে, কিন্তু হৃদয়ের দিক থেকে আমরা এখনো সেই বাংলারই মানুষ। বৈশাখ তাই আমাদের জন্য এক অনন্ত বন্ধন যা সময়, দূরত্ব, কিংবা প্রবাসের সীমাবদ্ধতা কোনোভাবেই ভাঙতে পারে না।
নতুন বছরের প্রারম্ভে আমাদের প্রত্যাশা, নিজেদের শিকড়কে ধরে রেখে আমরা যেন বিশ্ব নাগরিক হিসেবে আরও সমৃদ্ধ হতে পারি। বাংলা সংস্কৃতির সৌন্দর্য, মানবিকতা এবং সহনশীলতার বার্তা যেন ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে।
শুভ নববর্ষ।শুভ হোক সকলের জীবন।
আবুল কালাম আজাদ কলামিস্ট নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্রcolumnistazad@gmail.com
এমআরএম