‘এই তো দেখুন, বৈঠকটি ভালো হয়েছে,’— গত শনিবার ইরানের সঙ্গে ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এ কথা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘অধিকাংশ পয়েন্টে আমরা একমত হয়েছি, কিন্তু একমাত্র যে বিষয়টি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল—পারমাণবিক ইস্যু—সেটিতে একমত হওয়া যায়নি।’ আর তাই হুট করে তিনি ঘোষণা করেন, আরও ভালো চুক্তি আদায়ের লক্ষ্যে তিনি হরমুজ প্রণালি অবরোধ করছেন।
কিছু ভাষ্যকার ধারণা করেছিলেন, ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আরেকটি ‘অন্তহীন’ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং এই আলোচনা হয়তো সংঘাতের একটি নতুন ও সম্ভবত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ের প্রস্তাবনা ছিল।
তবে রোববার আলোচনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার পর মনে হচ্ছে, ইসলামাবাদের এই অচলাবস্থার মানেই নিশ্চিতভাবে যুদ্ধে ফিরে যাওয়া নয়। অবরোধটি অবশ্যই একটি চাপের কৌশল, তবে এটি প্রাথমিকভাবে সামরিক কোনো পদক্ষেপ নয়। ট্রাম্পের আর কোনো সশস্ত্র সংঘাতের ইচ্ছা নেই। তিনি জানেন যে এর সুফল সীমিত এবং আর্থিক খাতের ব্যবসায়ীদের ভাষায় এর চরম ঝুঁকির আশঙ্কা অনেক বেশি। তার লক্ষ্য হলো চরম বিপর্যস্ত ইরানকে একটি অর্থনৈতিক যাঁতাকলে ফেলা, যাতে দেখা যায় দেশটির নেতারা একটি বড় ও ব্যাপক চুক্তির মাধ্যমে ভিন্ন কোনো পথে হাঁটতে রাজি হন কি না।
মার্কিন পক্ষ আশা করছে, গত সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে অচলাবস্থা তৈরি হলেও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ সম্ভবত অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্প এখনো সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথেই হাঁটতে চান।
আরও পড়ুন>>ইরানের ‘কোনো তাড়া নেই’, বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টেএকদিনেই কেন ভেস্তে গেলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা?দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন/ ইরান যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ‘লুজার’ ট্রাম্প
‘যদি কোনো সমস্যার সমাধান করতে না পারেন, তবে সেটিকে আরও বড় করে তুলুন।’ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ারের নামে প্রচলিত এই পরামর্শটিই মনে হচ্ছে ট্রাম্পের কৌশল। কয়েক সপ্তাহের তীব্র বোমাবর্ষণের পরেও ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে আছে এবং তাদের হাতে এখনও পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্টাংশ ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার মতো বড় কার্ড রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প একটি ‘টিফানি ডিল’ (দামি চুক্তি) প্রস্তাব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন: অর্থনৈতিক সুবিধার একটি বড় প্যাকেজ, যার মধ্যে রয়েছে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। বিনিময়ে ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসলামাবাদের আলোচনা প্রত্যাশিতভাবেই কঠোর মেজাজে শুরু হয়েছিল, যেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ নিজ নিজ অবস্থান পরিষ্কার করেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পর গালিবাফ মার্কিন প্রতিনিধি দলের কাছে একজন মার্জিত এবং পেশাদার সমঝোতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এএমনকি তাকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নেতৃত্ব হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অন্য কর্মকর্তারাও নিজস্ব চ্যানেল খুলছেন, কারণ তারাও ভবিষ্যতের অংশ হতে চান।
এসবই হয়তো সেই ধরনের আকাশকুসুম কল্পনা হতে পারে যা একসময় মার্কিন কর্মকর্তারা ইরাক বা আফগানিস্তান নিয়ে করেছিলেন। গালিবাফ দুই দশক ধরে নিজেকে একজন বাস্তববাদী এবং ‘দাভোস’ ঘরানার নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। ২০০৬ সালে তেহরানের মেয়র থাকাকালীন তিনি রাস্তার গর্ত মেরামত এবং আবর্জনা পরিষ্কার করার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের মতো পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে চেয়েছিলেন। এখন ২০ বছর পর, পরিবর্তনকামী হিসেবে গালিবাফের জন্য সময় এসেছে কিছু করে দেখানোর অথবা চুপ হয়ে যাওয়ার।
ট্রাম্প এখন কী করবেন?
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান আজ যথেষ্ট শক্তি প্রদর্শন করলেও ভেতর থেকে তারা জীর্ণ। ৪০ দিনের যুদ্ধের পর দেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রম নেই বললেই চলে, যা অনেকটা কোভিডের সময়ের সামরিক সংস্করণের মতো। ট্রাম্প এখন অর্থনীতিকে আরও শক্তভাবে চেপে ধরার পরিকল্পনা করছেন, অনেকটা একজন ইউএফসি ফাইটারে মতো যিনি তার প্রতিপক্ষকে ‘চোকহোল্ড’ করে ধরে রাখেন এবং প্রতিপক্ষ কখন ‘ট্যাপ আউট’ (হার স্বীকার) করবে তার অপেক্ষা করেন। ট্রাম্প গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই সেই হার স্বীকারের অপেক্ষায় আছেন এবং তার এই অতিরিক্ত আশাবাদকে সমালোচকরা বড় ভুল হিসেবে দেখছেন।
এই ‘ট্যাপ আউট’ রূপকটিই হলো অবরোধের মূল যুক্তি। এই কৌশলের সংক্ষিপ্ত নাম হতে পারে ‘অপারেশন ইকোনমিক এপিক ফিউরি’। বলা হচ্ছে, ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন স্থল আক্রমণ বা অন্য কোনো সামরিক উসকানি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি চোরাবালিতে ফেলে দিতে পারে। হোয়াইট হাউজের কাছে এটি স্পষ্ট হয়েছে (যা সমালোচকরা আগে থেকেই সতর্ক করছিলেন) যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু করা সহজ কিন্তু থামানো খুব কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্র যখন অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেখছেন:
প্রথমত, ইরানে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটতে পারে। ওয়াশিংটনের মতে যুদ্ধ চলার সময়ের চেয়ে যুদ্ধ থামার পর এটি ঘটার সম্ভাবনা বেশি। দ্বিতীয়ত, গালিবাফ বা অন্য কোনো নতুন নেতা ট্রাম্পের দেওয়া সেই ‘গোল্ডেন ব্রিজ’ বা সোনালী সেতু পার হয়ে একটি নতুন ভবিষ্যতের দিকে যেতে পারেন। তৃতীয়ত, আইআরজিসির কট্টরপন্থিরা অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করতে পারে বা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করতে নতুন কোনো হামলা চালাতে পারে।যদি ইরান সামরিক হামলার মাধ্যমে তাদের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে, তবে ট্রাম্প হয়তো সেই সামরিক সংঘাতের দিকেই এগোতে বাধ্য হবেন যা তিনি এড়াতে চান। ইসলামাবাদে ট্রাম্পের দলের নেওয়া কৌশলের ঝুঁকি এখানেই—তারা দেখিয়েছেন যে একটি শান্তি চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু দিতে প্রস্তুত। কিন্তু ট্রাম্প ধাপে ধাপে দরকষাকষি করেন না। তিনি মনে করেন ছোট ছোট চুক্তিতে ফলও ছোট আসে।
এটাই এখানকার যুক্তি। কেকের আকার বড় করুন, একইসঙ্গে তেহরানকে মার্কিন শর্ত মানতে বাধ্য করতে অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র করুন। এর লক্ষ্য হলো গালিবাফ এবং তার সহকর্মীদের বোঝানো যে, একটি বিপ্লবী ‘উদ্দেশ্য’ যা পুরো অঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলে, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রকৃত দেশে পরিণত হওয়া, যা তাদের প্রতিবেশী সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দ্রুত ও লাভজনকভাবে আধুনিক হতে পারে।
লেখা: ডেভিড ইগনাটিয়াসসূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
কেএএ/