নারী অগ্রযাত্রার প্রতিফলন রূপে দাঁড়িয়েছেন টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিনাত জাহান। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার সকল প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা আর কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদে বর্তমানে রয়েছেন তিনি। কর্মক্ষেত্রের ধারাবাহিক এই অগ্রযাত্রার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সচিব হওয়ার অপার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছেন তিনি।জানা যায়, বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলা শহরের আরামবাগ এলাকার এক সাধারণ পরিবারের সন্তান জিনাত জাহান। তার বাবা মরহুম কাজি মো. আব্দুল কুদ্দুস। পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। মা রেহেনা বেগম একজন গৃহিণী। পরিবারের তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের মধ্যে তিনিই ছোট। পটুয়াখালী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও একই জেলার মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। জেলার শহর থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষে শিক্ষার অদম্য চেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা প্রমাণ করেন তিনি। দেশের এই সর্বোচ্চ ও খ্যাতিমান বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির গৌরব অর্জন সত্ত্বেও কঠোর অধ্যাবসায় আর অসাধারণ মেধা চর্চায় বিরতি দেননি তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান রক্ষার পাশাপাশি অদম্য শিক্ষা চর্চার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন তিনি। শিক্ষা জীবনের ধারাবাহিক সাফল্যেই ২৭তম বিসিএস এ প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী কমিশনার পদে মৌলভীবাজার জেলায় প্রথম নিয়োগ পান তিনি। শুরু হয় কর্ম জীবন। কর্ম জীবনের শুরু থেকেই দৃঢ়তা, সততা আর দক্ষতা দিয়েই পেশাজীবনে এগিয়ে চলা তার। ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান তিনি। এ দায়িত্বকালের কর্মতৎপরতা আর উপজেলাবাসীর ভূমি সংক্রান্ত সর্বোচ্চ সেবাদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায়িত্ব পান তিনি। তার এই দায়িত্ব গ্রহণের পরই সদর উপজেলাবাসী পেয়েছেন জেলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নাগরিক সেবা পদ্ধতি।জিনাত জাহানের কর্মতৎপরতা ২০১৬ সালে এপ্রিল মাসে সদর উপজেলা কার্যালয়ে চালু হয় ডিজিটাল নাগরিক সেবা পদ্ধতি। এ সেবায় জনগণ পাচ্ছে সম্পূর্ণ কম্পিউটার পদ্ধতিতে সময় উপযোগী সেবা। সদর উপজেলার ডিজিটালাইজ পদ্ধতিতে এ উপজেলাবাসী পাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধাভাতা, বয়স্কভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সেবা। ডিজিটাল সেন্টার থেকে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে গণশুনানি করে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের বিভিন্ন সমস্যার হচ্ছে সমাধান। প্রতিটি ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ রোধকল্পে চলছে সভা-সেমিনার ও উঠান বৈঠক। যেকোনো সময় ও খুব সহজে জনগণের তথ্য নিতে কার্যালয়ে তৈরি হয়েছে রেকর্ড রুম। এ কার্যালয়ে কী কী সেবা পাবেন জনসাধারণ জানতে তৈরি হয়েছে সিটিজেন চার্টার। এছাড়া এ উপজেলাবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থায় রয়েছে তার সচেষ্ট ভূমিকা। এছাড়া তার এই দক্ষ কর্মতৎপরতার দৃষ্টান্তরূপে গড়ে উঠছে সম্প্রসারিত বহুতল উপজেলা পরিষদ ভবন। এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিনাত জাহান বলেন, শিক্ষাজীবনের সফলতার পেছনে রয়েছে তার পরিবারের অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে। তার পরিবার কখনই চার ভাই বোনকে আলাদা করে দেখেনি। তার পরিবার প্রত্যেকটি সন্তানের ইচ্ছা ও স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করেছেন। ফলশ্রুতিতে তাদের মতো অতি সাধারণ পরিবার থেকে বড় বোন ইসরাত জাহান বাংলাদেশ প্ল্যানিং কমিশনের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি, মেজো বোন নিশাত জাহান লেখক ও কবি আর ভাই কাজি মো. কামরুজ্জামান ডিস্ট্রিক কালচারাল অফিসার এবং সর্বশেষ তিনি। দাম্পত্য জীবনে তিনি জাওয়াদ তাজওয়ার (৮) ও সাদিব তাজওয়ার (২) নামের দুই ছেলে সন্তানের জননী। স্বামী আহাদুজ্জামান মিয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। রাষ্ট্রীয় সফরে মিশরে আছেন।জিনাত জাহান বলেন, প্রতিটি পরিবারের মাকে ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি না করে সমান দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে।এর ফলে প্রতিটি পরিবারের মেয়েরা ছেলে সন্তানের মতো বিদ্যা ও বুদ্ধিতে বড় হবে। এরই মাধ্যমে দেশের নারী সমাজ এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি পরিবার হবে উপকৃত। একইভাবে দেশ পাবে একটি শিক্ষিত নারী জাতি। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সামাজিক দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন দাবি করেছেন তিনি।আরিফ উর রহমান টগর/এএম/পিআর