বিশেষ প্রতিবেদন

পরিবারের অভাবে তারা আজ শিশুশ্রমিক

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের সোলাইমান বাদশা। ডাক নাম সুমন। বয়স ১০ কিংবা ১১। বাবা-মার দেয়া নামের মর্মার্থ যখন উপলব্দি করতে পেরেছিল তখন থেকেই ইচ্ছা ছিল নায়ক হবে। সিনেমায় অভিনয় করবে। সবাই তাকে চিনবে। অটোগ্রাফ নেবে, ভালোবাসবে; তার সঙ্গে ছবিও তুলবে।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! বাংলার শাকিব খানতো দূরের কথা সপ্তাহে একটি বাংলা সিনেমা দেখারও সময় হয় না বাদশার। সারাদিন ঘুরেফিরে তিন-চারটি শব্দই বলে সে। ‘গুলিস্তান, আজিমপুর, বিডিআর, সেকশন।’

শিশু বাদশা বর্তমানে গুলিস্তান থেকে নবাবগঞ্জ-সেকশন রুটের লেগুনার হেল্পার হিসেবে কাজ করে। গল্প করার জন্য চটপটে বাদশার সময় নেই। সেকশনে গিয়ে পাঁচ মিনিটের বিরতি, এরপরই সিরিয়াল চলে আসবে তার লেগুনার।

জীবনের গল্প জানার আগে তাকে ডেকে বললাম, ‘বসো দুই মিনিটের জন্য।’ কোনো কথা না বলে অনেকটা অপ্রস্তুতভাবে বসল সে।

গল্প করে জানা গেল, বাদশার বাবা নাজির মোহাম্মদ, পেশায় একজন মৌসুমি কৃষক। কখনও আবার ভ্যানচালক। মা সাদেকা বেগম ঘরের কাজ করেন। বাদশা ছাড়াও পরিবারে আরও তিন ভাই-বোন। বাদশার বড় রুমা (১৪)। ছোট দুই ভাই নিলয় (৫) আর নিহাদ (২)। বাড়ির পাশে চিত্রকোট ইউনিয়নের একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়তো সে। রোল নম্বর ৩ হয়ে নার্সারি থেকে ক্লাস ওয়ানে ওঠে। ততদিনে বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছোটরা অনেক ছোট। তাই বাবার একার পক্ষে পাঁচজনের সংসার চালানো দুরূহ। এরপর বাংলা সিনেমার সেই পুরনো গল্প। টাকার অভাবে পড়াশোনা ছাড়তে হয় তাকে। পড়াশোনা তো দূরের কথা তিনবেলা খাবারই জুটছিল না তাদের।

নৌকা আর বাসে চড়ে বাবা-মাকে ছেড়ে চার মাস আগে ঢাকায় চলে আসে বাদশা। বাবুবাজার ব্রিজ থেকে নেমে কোথায় যাবে জানা ছিল না তার। কাজ চাইতে চাইতে উপস্থিত হয় বংশালের একটি টিনের দোকানে। কিন্তু মালিক কোনোভাবেই তাকে কাজে রাখতে রাজি নন। তিনি বাদশাকে পরামর্শ দিলেন নিউমার্কেট যাওয়ার, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করার।

কাজের সন্ধানে সেদিনই নিউমার্কেটে যায় বাদশা। প্রথমে রাহা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি টেইলার্সে চা-পানি আনার কাজ করে সে। সেখান থেকে জলিল নামের এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তার হাত ধরেই লেগুনার হেল্পার বাদশা।

বাড়ি থেকে কেন এলে? সেখানেই কোনো কাজ করতে- এমন কথা শুনে বাদশাহ বলে, ‘মা-বাপে জোর কইরা পাঠাইছে। কইছে ঢাকা থেকা টাকা পাঠাইতে। তা না হলে কয়েকটা টাকার লেগা সারাদিন কষ্ট করতাম না?’

গুলিস্তান-নবাবগঞ্জ রুটে লেগুনার হেল্পারি করে বাদশার প্রায় ৫০০-৬০০ টাকা আয় হয়। প্রতি ট্রিপে ৫০ টাকা। ড্রাইভার প্রতি ট্রিপে নেন ১০০ টাকা। আর লাইনম্যানকে দিতে হয় ৭০০ টাকা।

বাদশাহ বলে, ‘সারাদিন গুলিস্তান গুলিস্তান চিল্লাইতে চিল্লাইতে আর প্যাসেঞ্জারগো লগে কথা কইতে কইতে অস্থির লাগে। অভাব না থাকলে বাড়ি যাইয়া পড়ালেখা করতাম।’

বাদশার মতো রাজীব হাসানও একই রুটের লেগুনার হেল্পার। তার বাড়ি রাজশাহীর সাহেব বাজারে। বাবা-মার অভাব সহ্য না করতে পেরে ঢাকায় চলে আসে সে।

রাজীব সত্য বলছে কিনা- জানতে তার কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ফোন দিলাম বাবা জাকির হাসানকে। তিনি বলেন, আমি পঙ্গু। ওর মা মানুষের বাসায় কাজ করে। রাজীব কাজ না করলে খাব কেমনে?

জাগো নিউজের সঙ্গে ৬-৭ জন শিশুর কথা হয়। তাদের সবার বক্তব্য একই। পরিবারের অভাবের কারণে শ্রমিকে পরিণত হয়েছে তারা।

এআর/এমএআর/বিএ