আজ ১২ অক্টোবর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যায়(বেরোবি) দিবস। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অকৃত্রিম প্রচেষ্টায় ১২ অক্টোবর ২০০৮ রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে ৩০তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অরাজনৈতিক সরকারের করা বিশ্ববিদ্যালয় এটি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আবার রংপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। বিভিন্ন সরকারের আমলে বারবার রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়টি আর স্বপ্নের সীমা অতিক্রম করে বাস্তবতার ভূমিতে উপনীত হতে পারেনি।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন রংপুরবাসীর যৌক্তিক আন্দোলনে সাড়া দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রংপুরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। সময় স্বল্পতার কারণে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ না করে কারমাইকেল কলেজের ৭৫ একর জমি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। ১২ জন শিক্ষক ও ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে রংপুর শহরের ধাপ লালকুঠি এলাকায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারকর্তৃক বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর আইন-২০০৯’ জাতীয় সংসদে পাসের মাধ্যমে নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার নামানুসারে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু করে। ২০১২ সালের মধ্যে ছয়টি অনুষদের অধীনে ২১টি বিভাগ চালু করা হয়। এছাড়া উচ্চতর গবেষণার জন্য রয়েছে একটি ইনস্টিটিউট। যার নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। মোট শিক্ষক রয়েছেন ১৪২ জন। শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় নয় হাজার। নির্মাণাধীন একটি ছাত্রী হলসহ মোট তিনটি আবাসিক হল, প্রশাসনিক ভবন, চারটি অ্যাকাডেমিক ভবন, মসজিদসহ ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে।
২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যতগুলো কাজ হওয়ার কথা, তার প্রায় সব কটিই চলমান। ২০১২-১৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের কাজ হওয়ার কথা থাকলে তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি এবং তৃতীয় ধাপের কাজ ২০১৫-২০১৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা থাকলে সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভৌত কাঠামো উন্নয়নে তেমন উদ্যোগ নেননি।
তবে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ যোগদানের পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির এ পর্যায়ে আসতে নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে গেছে ৯ বছর। এ দীর্ঘ সময়ে বেরোবি শিক্ষা নিয়ে অনেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখেছে।
দেশের উত্তরবঙ্গের অন্যতম বিদ্যাপীঠের নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সোমবার উদযাপন করেছে বেরোবি প্রশাসন। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৯টায় জাতীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শুভেচ্ছাবাণী পাঠ করার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ।
পরে শান্তির প্রতীক পায়রা অবমুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি এবং রোভার স্কাউটের অভিবাদন গ্রহণ করার পর বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আনন্দ শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেবেন উপাচার্য।
দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠানে সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অংশগ্রহণে আয়োজিত দিনব্যাপী অ্যাকাডেমিক ফেয়ার ও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচির উদ্বোধন হবে। এছাড়াও সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দুপুর দেড়টায় কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বে সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি থাকবেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য জনাব এইচ এন আশিকুর রহমান এমপি। আলোচনা অনুষ্ঠানের পর সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় চিলেকোঠা ও অগ্নিস্নান ব্যান্ড দলের অংশগ্রহণে কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিষ্ঠার নবম বছরে তীব্র সেশনজটে, শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকট, পরিবহন সংকট, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, ইন্টারনেট ব্যবহারসহ এখনও নানা সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত রয়েছে।
গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকলেও ৯ বছরের পথচলায় শিক্ষা ও গবেষণা খাতে অসামান্য মেধার প্রমাণ রেখেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করে দেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অবদান রেখে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা সমস্যা ও প্রতিকূলতার মাঝেও বেগম রোকেয়ার আদর্শ লালন করে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা।
নয়টি বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপূর্ণ বিকাশে যথেষ্ট সময় নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রায় দু’বছর টানা আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবরোধ, সংঘর্ষ সত্ত্বেও থেমে নেই বিশ্ববিদ্যালয়টির অর্জন। শুভ্রতা ছড়ানো কাশফুল, কৃষ্ণচূড়া, বকুল শোভিত পথ, লাল অবয়বের ভবন প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্যের মাঝে ভিন্ন স্বকীয়তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
সবার প্রত্যাশা, নানা সমস্যা ডিঙিয়ে সাফল্যের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। শুভ জন্মদিন বেগম রোকেয়া বিশবিদ্যালয়।
সজীব হোসাইন/এএম/পিআর