দেশজুড়ে

নওগাঁয় কৃষিতে ক্ষতি ৫০২ কোটি টাকা

উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং অতিবৃষ্টিতে নওগাঁর ১১টি উপজেলায় কমবেশি বন্যাকবলিত হয়। এতে জেলার মোট ৯৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭২টি ইউনিয়নের ৫৮১টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বন্যার পানি প্রায় ১ মাস স্থায়ী হয়।

জেলার ১১টি উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার ১০৪ জন কৃষকের রোপা আমন ও আউশ ধান এবং সবজি আবাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫২ হাজার ৬০৯ হেক্টর।

টাকার অঙ্কে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অথচ বন্যায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষি বিভাগ থেকে প্রণোদনা হিসেবে শস্যবীজ ও সার বিতরণ করা হবে মাত্র ১৪ হাজার কৃষকদের মধ্যে। আর ১৪ হাজার কৃষককে মোট ১ কোটি ৩১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৩১ টাকা প্রণোদনা দেয়া হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৪ হাজার কৃষককে কৃষি প্রণোদনার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কৃষি প্রণোদনা হিসেবে কৃষকদের মধ্যে শস্যবীজ হিসেবে সরিষা, ভুট্টা, গ্রীষ্মকালীন মুগ ও বিটি বেগুনের বীজ এবং সার বিতরণ করা হবে।

প্রতিজন কৃষককে ১ বিঘা জমির আবাদ করতে যে পরিমাণ উপকরণ প্রয়োজন তা দেয়া হবে। উপকরণগুলোর মধ্যে প্রতিজন কৃষক পাবেন ডিএপি ২০ কেজি, এমওপি ১০ কেজি, সরিষা বীজ ১ কেজি করে ১২ হাজার জন, ভুট্টা ২ কেজি করে ২ হাজার ৪০০ জন, মুগ ৫ কেজি করে ৭০০ জন।

এছাড়া বিটি বেগুনের বীজ ২০ গ্রাম করে ২৪ জন এবং ডিএপি ১৫ কেজি ও এমওপি ১৫ কেজি। সেই সঙ্গে ২০ হাজার ৮০০ কৃষককে বীজ ও সার দিয়ে পুনর্বাসন করা হবে।

চলতি বছর জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ করা হয়। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৮ হাজার ৪৩৮ হেক্টর জমি। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। রোপা আমনে মোট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৫টি। বন্যায় ১৩ হাজার ২০৯ হেক্টর জমির আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে। মোট ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

আউশে মোট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ৫১ হাজার ২১২ জন। সবজি আবাদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯৬২ হেক্টর জমি। ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ৯ হাজার ৬৭৭ জন।

জেলায় রোপা আমন, আউশ ধান ও সবজি আবাদে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৫২ হাজার ৬০৯ হেক্টর জমি। টাকার অঙ্কে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

নওগাঁ সদর উপাজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের চুনিয়গাড়ী গ্রামের নকিম উদ্দিন বলেন, বন্যায় আমার সাড়ে ৫ বিঘা ধানখেত পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। জমি রোপনে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। দেড়-দুমাস পর ধান কাটা হতো। কিন্তু বন্যায় পুরোটাই শেষ। পানি নেমে যাওয়ার পরও বীজের অভাবে আর লাগানো সম্ভব হয়নি। বাজারে ধানের চারা দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা পুন (৮০আটি)। এতো টাকা দিয়ে ধানের চারা কেনা সম্ভব না।

গাংজোয়ার গ্রামের বর্গাচাষি ইদ্রিস আলী বলেন, বর্গা নিয়ে তিন বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছি। বন্যায় সব জমি তলিয়ে ফসল নষ্ট হয়ে পচে গেছে। ব্যক্তি উদ্যোগ থেকে কিছু ধানের চারা পেয়েছিলাম। তা দিয়ে পাঁচ কাঠা জমিতে নতুন করে রোপন করেছি। বীজের অভাবে এখনও পুরোজমি অনবাদি ফেলে রাখতে হচ্ছে। সরকার থেকে বীজ ও সার সহায়তা দিলে আরও কিছু জমিতে আবাদ করতে পারতাম। এতে কিছুটা হলেও বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যেত।

বদলগাছী উপজেলার বালুভরা গ্রামের কৃষক ইমরান হোসেন বলেন, বন্যায় নষ্ট হওয়া পটলের মাচা ভেঙে নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। ১ বিঘা জমির পটলেরখেত থেকে মৌসুমে প্রায় ১ লাখ টাকার উপর বিক্রি হয়ে থাকে। যেখানে মাত্র কয়েক হাজার টাকা বিক্রির পর বন্যায় সম্পন্ন পচে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া ১০ কাঠা জমির মরিচ ও ১ বিঘা জমির পাট নষ্ট হয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষককে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি প্রণোদনা দেয়া সম্ভব নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ২ লাখ কৃষকের স্থলে মাত্র ১৪ হাজার কৃষককে প্রণোদনা দেয়ার জন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা খুবই নগন্য। তবে মন্ত্রণালয় থেকে পরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আগামী সপ্তাহে প্রণোদনা দেয়া শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আব্বাস আলী/এএম/আরআইপি